অকালে ঝরে পড়া ১০ হতভাগা বাংলাদেশি ক্রিকেটার

ক্রীড়া জগত:

দলীয় অর্জনের পাশাপাশি আমরা পেয়েছি আকরাম খান, হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিকের মত পূর্বসূরী। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসেছেন মাশরাফি-বিন-মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ, মুস্তাফিজের মতো বিশ্বমানের তারকা ক্রিকেটার। কিন্তু সব ক্রিকেটার কি তারকাখ্যাতি পেয়েছেন? কেউ কেউ হঠাৎ জ্বলে, অনেক স্বপ্ন দেখিয়ে নিভৃতেই ফুরিয়ে গেছেন তারা বাতির মতো। আমাদের আজকের প্রতিবেদনে বলবো এমনই ১০ জন হতভাগা ক্রিকেটারের গল্প, যারা ধূমকেতুর মতো এসে তারকা হয়ে আবার অল্পতেই হারিয়ে গিয়েছেন। হতভাগা এসব ক্রিকেটারের গল্প শুনলে চোখে পানি চলে আসতে পারে আপনারও_

১০) আফতাব আহমেদ

২০০৫ সালে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে ২১ বলে ২৮ রানের অপরাজিত ইনিংস। ঐতিহাসিক সেই জয়ের উইনিং রান এসেছিল এই আফতাব আহমেদের ব্যাট থেকেই। ব্যাটে-বলে জাতীয় দলের হয়ে জ্বলে উঠেছেন বারবার, কিন্তু এরপরই পড়ে যান নিষিদ্ধ আইসিএলের ফাঁদে। আইসিএল থেকে দেশে ফিরে এলে বিসিবি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেও নিজের মারকুটে ফর্মটা আর ফিরে পাননি আফতাব। ২০১৪-১৫ মৌসুম শেষে মাত্র ৩০ বছর বয়সের সব রকম ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তিনি। এর আগে ২০০৪ সালে টেস্ট এবং ওডিআই অভিষেক ঘটে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। একই বছর নিজের প্রথম ওডিআই সেঞ্চুরি তুলে নেন বাংলাদেশের শততম ওডিআই ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে। নিজেকে পুরোপুরি ভাবে মেলে ধরতে না পারার মূল কারণ ছিল আফতাব নিজেই। তিনি ক্রিকেটের মোটেও সিরিয়াস ছিলেন না।

৯) সোহাগ গাজী

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একই টেস্টে সেঞ্চুরি এবং হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ক্রিকেটার তিনি। চিটাগাং টেস্টে ড্র হওয়া ম্যাচে এই কৃতিত্ব গগড়েছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই যেন হারিয়ে গেল সম্ভাবনার সেই সূর্য, কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন ক্রিকেটার সোহাগ গাজী? দারুণ সম্ভাবনাময় ডানহাতি এই স্পিনার ছিলেন ক্যারিবিয়ান ব্যাটিং দানব ক্রিস গেইলের জম। গেইলের কল্যাণে ভালোভাবে আলোচনায় এসেছিলেন এই বাংলাদেশী তারকা। সোহাগ গাজীর বল মানেই ছিল গেইলের আউট। তবে সেই শুরুটা আর ধরে রাখতে পারেননি। জাতীয় দলে অনিয়মিত হতে হতে একসময় আড়ালে পড়ে যান তিনি। গরিব ঘরের ছেলে হিসেবে অনেক কষ্ট করে ক্রিকেটার হয়েছিলেন সোহাগ গাজী। বাংলাদেশ ক্রিকেটে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে তার পথচলা শুরু হয়েছিল তবে যেতে পারেননি বেশিদূর।

৮) আলামিন

হঠাৎই আলামিনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। ২০১৫ বিশ্বকাপের মাঝপথে জানলেন তিনি আর দলে নেই, টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে শুধু এটুকুই জানানো হলো শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে দেশে পাঠানো হচ্ছে। পরে জানা গেল, ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ব্রিসবেনে নিয়ম ভেঙে টিম হোটেলে ফিরেছেন রাত দশটার পর। এঘটনায় লম্বা সময় আল-আমিনকে দলের বাইরে থাকতে হয়েছে। এরপর ২০১৬ সালের বিপিএলের আবারও তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। বিপিএল-এ চট্টগ্রাম পর্বে আলামিন কারো রুমে ঢুকেছেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এটা দেখে জরিমানা করা হয়। এর আগে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে তিনি দলকে দিয়ে যাচ্ছিলেন নিজেকে উজাড় করে। ঘরের মাঠে ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বছরের ১০ ম্যাচেই শিকার করে নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। মাশরাফি, রুবেলদের সঙ্গে মিলে সমৃদ্ধ করেছিলেন দেশের পেস ব্যাটারি। তবে আজকের আলোচনার অন্য সকল ক্রিকেটারের থেকে ব্যতিক্রম ঘটেনি তার ভাগ্যে। হারিয়ে গেছেন অকালেই।

৭) মানজারুল ইসলাম রানা

রানা ২০০৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত খেলেছেন জাতীয় দলের হয়ে। কিন্তু অনিয়মিত হতে শুরু করেন ২০০৭ থেকে। ২০০৭ এর বিশ্বকাপের দলে নির্বাচিত হননি তাই। হাল ছাড়েননি তিনি, একনিষ্ঠভাবে চেষ্টা করতে থাকেন ফর্ম ফিরে পাওয়ার। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ভালো পারফর্ম করতে শুরু করেন। কিন্তু এরই মধ্যে এসে যায় ২০০৭ সালের ১৬ মার্চের কালো দিন। সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে মাত্র ২২ বছর বয়সে খুলনায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন এই সম্ভাবনাময় অলরাউন্ডার।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার আগে রানা তৎকালীন অধিনায়ক হাবিবুল বাশারকে বলেছিলেন- সুমন ভাই একটা ম্যাচে কিন্তু জিততেই হবে। তার মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার দুদিন পর খেলতে নেমে শোকার্ত বাংলাদেশ ধরাশায়ী করেছিল শক্তিশালী ভারতকে। বাঁহাতি স্পিনার কাম লেট অর্ডারে দ্রুত রান তুলতে পারা এই রানা কোচ এবং দলের অধিনায়কের আস্থাভাজন একজন ছিলেন শুরু থেকেই। কিন্তু তার চূড়ান্তভাবে জ্বলে ওঠার দিনটি আসে ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, রানা তৃতীয় ওয়ানডেতে ৩৪ রানে চারটি এবং চতুর্থ ওয়ানডেতে ৩৬ রানে চারটি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের সিরিজ জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন। হন সিরিজের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী। কী দারুণভাবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষটা হয়েছে তার চরম হতাশার মাধ্যমে।

৬) মেহরাব হোসেন অপি

১৯৯৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করা ১০১ রানের সেই দুর্দান্ত ইনিংসের মাধ্যমে তার জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বদরবারে। অপির সেই সেঞ্চুরিই ছিল ওয়ানডেতে কোন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের প্রথম সেঞ্চুরি। এরইমধ্যে ঘরোয়া ক্রিকেটে তার একটি শর্টে আহত হয়ে ভারতীয় ক্রিকেটার রমন লাম্বার মৃত্যু হয়। এতে বেশ মানসিক আঘাত পান তিনি, বেশ কিছুদিন ক্রিকেট থেকে দূরেও ছিলেন। ফেরার পর আর আগের মত ফর্ম ফিরে পাননি তিনি। দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি তার, কর্পোরেট ক্রিকেট লীগে অর্থের বিনিময়ে অংশগ্রহণ করেও প্রতিপক্ষ প্রতিষ্ঠান সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় ২০০৩ সালে তাকে ঘরোয়া ক্রিকেটে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি। একই বছর অপি বিদায় জানান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে।

৫) এনামুল হক জুনিয়র

ক্যারিয়ারে ১৫ টেস্টে ৪৪ টি এবং ১০ টি ওয়ানডেতে ১৪টি উইকেট শিকার করা এনামুল দলের নিয়মিত ছিলেন ২০১০ সাল অবধি। এরপর জাতীয় দলে অনিয়মিত হয়ে গেলেও ঘরোয়া ক্রিকেট এবং বিপিএলে নিয়মিত দেখিয়েছেন তার প্রতিভার প্রদর্শনী। কিন্তু ২০১৩-এর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর দেখা মেলেনি এনামুলের।

এর আগে মোহাম্মদ রফিকের ইনজুরির কারণে ২০০৩ সালে টেস্ট অভিষেক হয় এনামুল হক জুনিয়রের। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই বাঁহাতি স্পিনার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক টেস্ট ১২টি উইকেট নিয়ে একাই ধ্বসিয়ে দিয়েছিল প্রতিপক্ষ শিবির। এনে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের বহুল বহুল প্রতীক্ষিত টেস্ট জয়। দারুণভাবে ক্যারিয়ার শুরু করা এনামুল জুনিয়র হারিয়ে গেছেন সময়ের সাথে সাথে।

৪) অলক কাপালি

দলের প্রয়োজন পূরণ করা একজন ক্রিকেটার হলেও কাপালির ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতার অভাব ছিল স্পষ্ট। এর মধ্যে ২০১৮ সালে তার ক্যারিয়ারে নেমে এলো নিষিদ্ধ আইসিএলের অভিশাপ। আরও অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গে নিষিদ্ধ হন তিনিও। ২০০৯-এ আইসিএল থেকে সরে এসে জাতীয় দলে ডাক পেলেও পুরাতন সেই ফর্ম আর ফিরে পাননি। ঘরোয়া ক্রিকেট ও বিপিএলেও আর জ্বলে উঠতে দেখা যায়নি তাকে। তবে কোনো রকমে খেলে যাচ্ছেন এখনও।

এর আগে ২০০২ সালে লঙ্কানদের বিপক্ষে টেস্ট এবং ওডিআই ক্যারিয়ার শুরু করেন আলোক কাপালি। ২০০৩ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে হ্যাটট্রিক করার রেকর্ড গড়েন মাত্র ১৯ বছর বয়সে। ২০০৮ সালের এশিয়া কাপের ৮৬ বলে সেঞ্চুরি করে কোন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের পক্ষে দ্রুততম শতকের রেকর্ড গড়েন তিনি। দু’বছর সেটা নিজের করে নেন বাংলাদেশ দলের বর্তমান অধিনায়ক সাকিব আল হাসান।

৩) নাসির হোসেন

বাংলাদেশ ক্রিকেটের হাতেগোনা কয়েকজন ব্যাড বয় এর অন্যতম একজন। আবার তিনি বাংলাদেশের হাতেগোনা কয়েকজন ফিনিশার এর মাঝে অন্যতম। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল থেকে নিজের পথ হারিয়েছেন আরো বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই সাথে সম্ভাবনাময় আরো একজন বাংলাদেশী ক্রিকেটারের হয়েছে অপমৃত্যু। একজন নাসির আসলেন, খেললেন, জয় করলেন, আবার হারিয়ে গেলেন।২০১১ সালের শেষের দিকে ক্যারিয়ার শুরু করা নাসির হোসেন অল্প সময়ের মাঝেই দেশের অন্যতম সেরা একজন ক্রিকেটারে পরিণত হয়েছিলেন। তবে সেখান থেকে বাদ পড়া গল্প সবারই জানা। তাকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

২) মোহাম্মদ আশরাফুল

বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম প্রেম ও প্রথম কলঙ্ক বলা হয় মোহাম্মদ আশরাফুলকে। দেশের পক্ষে অধিনায়কত্ব করেছেন ওডিআই, টি-টোয়েন্টি উভয় ফরম্যাটেই। এরইমধ্যে ২০১৩ সালের বিপিএলে ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারির সাথে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে, দোষ স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চান আশরাফুল। ২০১৪ সালে মোট ৮ বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ করা হয় তাকে। শাস্তি কিছুটা মওকুফ হওয়ায় ২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট এই নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়েছেন আশরাফুল।

এর আগে নিজের ১৭তম জন্মদিনের একদিন আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তার। সেদিনের সেই ছোট্ট আশরাফুল অভিষেকেই ১১৪ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে গড়েন সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে টেস্টে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড। বাংলাদেশ সেই টেস্টে হারলেও ক্রিকেটবিশ্ব পেয়ে যায় নতুন এক লিটল টাইগারের হদিস। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে এমন অনেক বিস্ময়কর ইনিংসের কারিগর তিনি। তবে তার প্রতিভার সমানতালে মেলে ধরা হয়নি পুরোটা।

১) শহীদ জুয়েল

আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল নামে বেশি পরিচিত। ১৯৬৬ সালে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক। পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত ক্রিকেট ক্যারিয়ারের এই প্রতিভাবান তরুণ খেলেছেন আজাদ বয়েজ ক্লাব, মোহামেডানের মতো ক্লাবের হয়ে। অপরিহার্য অংশ ছিলেন আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত ইস্ট পাকিস্তান দলেরও। ডাক পেয়েছিলেন পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলারও, কিন্তু স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে চাপানোর। ১৯৭১ সালে ক্র্যাক প্লাটুনের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন এর অপারেশন চলাকালীন সময় তার ডানহাত বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর রাজাকারদের যোগসহযোগে ২৯ আগস্ট পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন। আজ যখন অনেক প্রতিভাবান তরুণ জাতীয় দলের হয়ে ব্যাটে-বলে প্রতিপক্ষকে শাসন করেন, তখন হয়তো তাদের মধ্যেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন একজন বীর বিক্রম শহীদ জুয়েল। এই স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বপ্নই তো দেখেছিলেন তিনি।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply