অবৈধ ইটভাটায় কক্সবাজারে ফসল উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা

শাহী কামরান

কক্সবাজারে ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে তৈরি করা হচ্ছে ইট। এতে জমির উর্বরতা হ্রাস পাওয়াসহ জমি হারিয়ে ফেলছে তার স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা। রহস্যজনক কারণে স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

সরজমিন জানা যায়, জেলায় ৬২টি ইটভাটা রয়েছে। মাত্র কয়েকটির বৈধ কাগজপত্র থাকলেও কাগজপত্র ছাড়াই চলছে বেশিরভাগ ভাটার কার্যক্রম। এসব ভাটার অধিকাংশই ফসলি জমি ভাড়া নিয়ে গড়ে উঠেছে। আর এসব ইটভাটার জন্য পার্শ্ববর্তী জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে। ধারণা না থাকায় কৃষক ও জমির মালিকরা অধিক মুনাফার প্রলোভনে জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন ভাটা মালিকদের কাছে। এতে চরম হুমকিতে পড়ছে জমির উৎপাদন ক্ষমতা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কৃষি জমি থেকে এভাবে ইট তৈরির মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরি করা ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য যে পুষ্টির প্রয়োজন তা সাধারণত মাটির উপরিভাগে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফারসহ ১৩ ধরনের পদার্থ থাকে, যা উদ্ভিদ বা ফসলের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেয়ার ফলে জমি থেকে এসব পদার্থ চলে যাচ্ছে ইটভাটায়, যা ফসলের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হচ্ছে। 

জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ও লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠ থেকে আমন ধান ওঠার পরপরই ফসলি জমির মাটি বিক্রি শুরু হয়। আর এসব মাটি ট্রাকে ও ট্রলিতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। মাটি বিক্রি করেছেন, এমন চার-পাঁচজন কৃষক জানান, ইটভাটায় মাটি সরবরাহের জন্য একশ্রেণির দালাল চক্র গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের মাটি বিক্রি করতে উৎসাহ জোগায় এবং স্বল্পমূল্যে উপরিভাগের এসব মাটি কেটে কিনে নেয়। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কথা না জেনে সহজ-সরল কৃষকেরা নগদ লাভের আশায় জমির মাটি বিক্রি করেন।

রামু এলাকার শিক্ষক জয়নাল আবেদীন বলেন, আগে পতিত বা চাষ হয় না—এমন জমির মাটি নিচু জায়গা ভরাট, রাস্তা উঁচু বা নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য কেটে নেওয়া হতো। আবার অনেকে পুকুর কাটার মাটি দিয়ে এসব কাজ করতেন। এখন ইটের ভাটায় মাটির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ফসলি জমির মাটি বেচাকেনা হচ্ছে দেদার। আসলে তাঁরা এসব ক্ষতির বিষয়টি জানেন না বলেই মাটি বিক্রি করছেন।

রামু ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষক শাহজাহান, মুজিবর, মতলেব, খালেকসহ জেলার অনেক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, প্রতিটি ইটভাটায় গড়ে ২৫ থেকে ৩০ লাখ ইট তৈরি করতে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি ঘনফুট মাটি ও বালু ব্যবহার করা হয়। এর অধিকাংশ জোগান দেয়া হয় ফসলি জমি থেকে। প্রশাসনের কোনো হস্তক্ষেপ না থাকায় বেপরোয়াভাবে কৃষি জমির মাটি চলে যাচ্ছে ইটভাটায়।

রামু ও সদর উপজেলায় অবস্থিত একাধিক ইটভাটার মালিক মুবারক বলেন, জমিতে ফসল হয়। কিন্তু জমির মালিক প্রজেক্ট করবে এ জন্য মাটি আমাদের কাছে তা বিক্রি করেছেন। তিনি আরও বলেন, রামু এলাকার যেসব জমিতে ফসল হয় না সেসব জমির মাটি ইটভাটার জন্য উপযোগী। আমরা ওই মাটি ১ বছর পর পর কিনে আনি। কারণ, প্রতিবছর ওই জমিতে পলি পড়ে।

জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির এক নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ইটের ভাটায় ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে সেটা সত্য। তাছাড়া জমির মালিকরা প্রজেক্ট করলে মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিক্রি করে। তারা আমাদের ইটের ভাটায় তা দেন।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মন্জুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের ফিল্ড অফিসাররা কৃষকদের মাটি বিক্রি করা থেকে বিরত থাকার জন্য সব সময় পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিষয়টি সম্পর্কে কৃষকরা সচেতন না থাকায় এ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কৃষকদের সচেতন করতে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বলেন, ফসলি জমির মাটি কিনেছে এমন অভিযোগ পেলে ইটভাটার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যারা ইট পোড়ানো শুরু করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply