অরণ্যে রোদন

শেখর বড়ুয়া।


ঘটনা:১
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাইয়ের (সিনিয়র সহকারি সচিব) কাছে প্রায় যেতাম। অত্যন্ত মেধাবী আর সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন।উনি আইন মন্ত্রণালয়ে ছিলেন যেটা তখন সুপ্রিমকোর্টে ছিল। প্রায় বলতেন, শেখর এখানে কাজ করে শান্তি পাই না। কারণ বেশীরভাগ কর্মচারী মানুষকে সেবা দেয়ার চাইতে হয়রানি করতে আগ্রহী, শুধুমাত্র অবৈধ কিছু অর্থ আদায় করার জন্য। আমি বললাম আপনি হয়রানি না করতে নির্দেশ দিলেই তো হয়! উনি কোন উত্তর দেন নি, শুধু মুচকি হেসেছিলেন।
ঘটনা:২
কিছুদিন আগে জেলা পর্যায়ের এক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। উনি আগেই একটা মিটিংয়ে থাকায় ওয়েটিং রুমে বসেছিলাম। সাধারণ জনগণের খুব ভীড় ছিল। অথচ কর্মচারীদের কয়েকজন তাদের সাথে এমন ব্যবহার শুরু করলেন তারা ভয়ে একদম চুপসে গিয়েছিলেন। কারো চোখ দিয়ে পানি চলে আসার মত অবস্হা। সেবাপ্রার্থীরা বেশীরভাগ বয়স্ক মানুষ ছিলেন,তারপর ও কোন দয়া বা মনুষ্যত্ববোধ কর্মচারীদের মধ্যে দেখলাম না। সবচাইতে খারাপ লেগেছিল একজন বারবার সিনিয়র কর্মকর্তাদের সমালোচনা করছিলেন কারণ উনি অত্যন্ত সজ্জন কর্মকর্তা। যে কেউ তাঁর রুমে ঢুকে সেবা গ্রহণ করতে পারে। আমি চিন্তা করলাম, যিনি জনবান্ধব, সজ্জন তাঁকে খারাপ বলা আর যিনি মানুষকে হয়রানি করেন তিনি ভাল, এই চিন্তা চেতনা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের দিয়ে আর যাই হোক উন্নত-জনবান্ধব-সেবামূলক রাষ্ট্র উপহার দেয়া সম্ভব নয়।

দেশের প্রত্যেকটা সেক্টরেই বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী রয়েছেন। সরকার পরিবর্তন হয় নিয়মিত, সিনিয়র কর্মকর্তাগণ ও কয়েকবছর পরপর পরিবর্তন হয় কিন্তু তারা ২০/২৫ বছর যাবৎ একই জায়গায় থেকে যায়। ফলে একেকজন দুর্নীতির বটবৃক্ষ হয়ে ওঠে, হয়ে যায় বেপরোয়া। অনেক সিনিয়র কর্মকর্তার পক্ষেও তাদের নিয়ন্ত্রণ দূরুহ হয়ে যায়।

দুদকের এক উপ-পরিচালক বন্ধুকে ফোন করেছিলাম,বললাম তোরা তো সবসময় রাঘব বোয়াল নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু এসব দিকে নজর না দিলে প্রান্তিক পর্যায়ের সেবা নিশ্চিত করা কি সম্ভব? তার উত্তর ছিল, এসব দুদক জানে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্হা নেয়া ও হচ্ছে। কিন্তু জনবল কম থাকায় তা খুব বেশী দৃশ্যমান হচ্ছে না। তবে দুদকের চাইতে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরগুলোকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।

এসব কর্মচারীদের মানুষের সেবার প্রতি অনীহা, সিনিয়র কর্মকর্তার আদেশ দেয়ার পর ও মানুষকে হয়রানি করা, দুর্নীতির বটবৃক্ষ হওয়ার মূল কারণ হল এক জায়গার অনেক বছর চাকরী করা। সবাইকে না হলে ও যারা অর্থ সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত তাদের কয়েকবছর পরপর বদলী সিস্টেম চালু থাকা উচিৎ। বর্তমানে যা শুধুমাত্র কোন অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়।

নীতি প্রণয়নের জায়গায় যেসব সিনিয়র কর্মকর্তারা আছেন তাঁরা যদি এই বিষয়ে নজর দেন তাহলে পাবলিক হেল্প সার্ভিসের পেইজগুলোতে যে পরিমাণ হয়রানি আর দুর্নীতির অভিযোগ দেখা যায় তা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

শেখর বড়ুয়া

লেকচারার, দর্শন

কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply