আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

সিবিএল২৪: আজ আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

জন্মের পর থেকে বেশির ভাগ সময়ই গেছে লড়াই-সংগ্রামে। হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্র—সবই দেখেছে দলটি। এরই মধ্যে ৭১ বছর পূর্ণ করল
আওয়ামী লীগ।

আজকের এই দিনে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডে আওয়ামী মুসলিম লীগের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও পরে তা শুধু আওয়ামী লীগ নাম নিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে বিকাশ লাভ করে। প্রতিষ্ঠার শুরুতে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল হক।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও আওয়ামী লীগের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। ১৯৫২–এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯–এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—সব অর্জনই হয়েছে এই দলের নেতৃত্বে।

১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন বিকালে ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় নতুন একটি রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তীতে সেই দলের নাম পরিবর্তন হয়ে হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

যেভাবে গঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগঃ

আওয়ামী লীগের উত্থান নিয়ে একটি বই লিখেছেন লেখক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহিউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলছেন, ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান হওয়ার পরে ঢাকায় মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন মাওলানা আকরাম খান এবং খাজা নাজিমুদ্দিন।

সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেম নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অনুসারী যে প্রোগ্রেসিভ (উদারপন্থী) নেতারা ছিলেন, তারা তখন সেখানে নিজেদের অবহেলিত মনে করছিলেন। তখন তারা মোঘলটুলিতে ১৫০ নম্বর বাড়িতে একটি কর্মী শিবির স্থাপন করেছিলেন। সেখানে তারা একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা চিন্তা করছিলেন। কলকাতা থেকে এসে শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সাথে যুক্ত হন।

তখন টাঙ্গাইলে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ পদত্যাগ করার কারণে শূন্য হওয়া একটি উপনির্বাচনে দুই দফায় মুসলিম লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী এবং শামসুল হক। কিন্তু তাদের দুজনের নির্বাচনী ফলাফলই অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

তখন তারাও এসে এই মুসলিম কর্মীদের সঙ্গে মিলে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা ভাবতে শুরু করেন। তারা একটি সভা ডাকেন। সেই সভা ডাকার প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান।

কিন্তু সেই সভা করার জন্য কোন অডিটোরিয়াম পাওয়া যাচ্ছিলো না। তখন কে এম দাস লেনের কাজী হুমায়ুন রশীদ তার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে সভা করার আহবান জানান।

সেখানেই ২৩শে জুন বিকালে আড়াইশো-তিনশো লোকের উপস্থিতিতে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রস্তাব অনুযায়ী সেই দলের নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।

সেই সঙ্গে পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’, যার সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

একটি জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী
একটি জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

যারা ছিলেন নবগঠিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বেঃ

নতুন দল গঠনের পর মওলানা ভাসানীকে দায়িত্ব দেয়া হয় একটি নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করার জন্য। তিনি অন্যদের সাথে পরামর্শ করে একটি কমিটি ঘোষণা করেন।

সেই নতুন কমিটির সভাপতি হলে মওলানা ভাসানী। সহ-সভাপতি হলেন আতাউর রহমান খান, আলী আমজাদ খান, আহমেদ আলী খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আবদুস সালাম খান।

সাধারণ সম্পাদক হলেন শামসুল হক।

ট্রেজারার হন ইয়ার মোহাম্মদ খান, যার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে প্রথম সভার আয়োজন হয়।

শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে আটক থাকলেও তাকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এভাবেই প্রথম ৪০ জনের কমিটি গঠিত হয়। তবে পরবর্তীতে তাদের অনেকে আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকেন নি।

পরের দিন, ২৪শে জুন আরমানিটোলা ময়দানে একটি জনসভা ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন মুসলিম লীগের কর্মীরা সেই সভায় হামলা করেছিলেন।

লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, ”অলি আহাদের বইতে একটি ভাষ্য পাওয়া যায় যে, রোজ গার্ডেনের সভায় কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন এ কে ফজলুল হক। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেল ছিলেন (বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল পদ)। কিন্তু সরকারি পদে থাকার কারণে তিনি কিছুক্ষণ পরেই সেখান থেকে চলে যান।”

পরবর্তীকালে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়।

১৯৫২ সালে মায়ের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে ’৫৪ সালের নির্বাচন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে এ দেশের মানুষ। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিদের হীন চক্রান্তের ফলে মেয়াদ উত্তীর্ণের আগেই ভেঙে দেওয়া হয় মন্ত্রিসভা। শুরু হয় লাগাতার গণতান্ত্রিক আন্দোলন। ’৬২-এর গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল, ’৬৬-এর বাঙালি মুক্তি সনদ ৬ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিণত হন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে। তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় চক্রান্ত। দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তাঁকে গ্রেপ্তার করে সম্পন্ন করা হয় ফাঁসিতে ঝুলানোর যাবতীয় আয়োজন। কিন্তু বাঙালি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের প্রিয় নেতাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে। শেখ মুজিব অভিষিক্ত হন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে।
Advertisements
তারপর ’৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ লাভ করে ইতিহাসের নজিরবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তবু ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি পাকিস্তানিরা। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ’৭১ সালের ৭ মার্চ। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ঘোষণা, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে মরণপণ মুক্তির সংগ্রামে। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লাখের মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে যখন অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখনই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে এই সংগঠনটিকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নব-উদ্যমে সংগঠিত হন। তারই ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনা ১৯৯৬-এর সরকার গঠন করে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। ২০০৮ সালে পুনরায় সরকার গঠন করে ‘রূপকল্প ২০২১’-এর আলোকে মধ্যম আয়ের সুখী-সমৃদ্ধশালী ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখান এবং ২০১৪ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ‘রূপকল্প ২০৪১’-এর আলোকে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জনের ধারাবাহিকতায় বাংলার জনগণ বিশ্বাস করে নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশ একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সে জন্য ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার দিবসটি বাঙালি জাতির জীবনে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply