আমাজানে দাবানল : কি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে

আমাজান দাবানল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র দাবানলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ খ্যাত আমাজনের চিরহরিৎ বন। আমেরিকার নয়টি দেশের প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে আমাজন বনের বিস্তৃতি। চিরহরীৎ বৃষ্টিবহুল এই বন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ। এর আয়তন ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ১৭ গুণ বেশি। বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলের দূরত্ব ১৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।

আমাজন বনে দাবানলের ঘটনা নতুন কিছু নয়। আগস্ট থেকে নভেম্বর সময়ে আমাজন বন শুষ্ক থাকে। আর এ সময়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রায়ই অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকে। গত বছর পর্যন্ত এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। কিন্তু এ বছর অস্বাভাবিকভাবে অগ্নিকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্রাজিল, পেরু, কলম্বিয়া, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, ভেনিজুয়েলা, গুয়ানা, চিলি ও আর্জেন্টিনায় আমাজন বনের বিস্তৃতি থাকলেও শুধু ব্রাজিলেই আমাজনের প্রায় ৬০ শতাংশ। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেনের ২০ শতাংশের উৎস এ আমাজন বনের গাছপালা। এজন্য এ বনকে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ও বলা হয়। বায়ুমণ্ডলের প্রায় ২৫ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড (২.২ বিলিয়ন মেট্রিক টন) শোষণ করে আমাজন বনের গাছপালা।

আমাজনে ৪০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিত এবং ৩ হাজার প্রজাতির ফল জন্মে; ১৩০০ প্রজাতির পাখি, ৩০০০ প্রজাতির মাছ, ৪৩০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড় এবং ৪০০ প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে। আধুনিক ওষুধ শিল্পের ২৫ শতাংশ কাঁচামাল আসে আমাজন থেকে। দক্ষিণ আমেরিকার ৭০ শতাংশ জিডিপির উৎস হচ্ছে আমাজন। আমাজন বনের পুরোটার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আমাজন নদী। সমুদ্রের ২০ শতাংশ মিঠাপানির সরবরাহ করে এই নদী। ১০ লাখ আদিবাসী মানুষের বসবাস এ বনে, যাদের অনেকেই এখন সভ্যতার সঙ্গে পরিচিত হয়নি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, আগুন এখন দীর্ঘস্থায়ী রূপে দেখা দিচ্ছে। ফলে বনের যে আদি গঠন, তা পরিবর্তিত হতে শুরু হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে আগে আমাজনের একটি অঞ্চল যেমন ছিল, তা আর তেমন থাকবে না। আমাজনের এই পরিস্থিতিই সবচেয়ে উদ্বেগের মনে করা হচ্ছে।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাজনের এ ক্ষয়ক্ষতি পুরো পৃথিবীর। তবে আমাজন বনের অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের ওপরও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তারা।

আমাজন মূলত পুরো পৃথিবীর জন্য একটি ‘শীতলীকরণ যন্ত্র’ হিসেবে কাজ করে। আমাজন আকারে এতটাই বিশাল যে যদি আমরা এটি হারিয়ে ফেলি, তবে পুরো পৃথিবীতে যে পদ্ধতিতে বাতাস ও শক্তি কাজ করে, সেটি বদলে যাবে।

বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলের দূরত্ব ১৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ড থেকে সৃষ্ট তাপ ও গ্রিনহাউস গ্যাসের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পাবে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়বে।

বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, যে পরিমাণ বন ধ্বংস হয়েছে তাতে মোট অক্সিজেনের সরবরাহ শূন্য দশমিক শূন্য তিন শতাংশ এবং কার্বন শোষণের পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য চার শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট পার্টিকুলেট ম্যাটার, ধোঁয়াশা, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনো-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, মারকারি, ডাইঅক্সিন ইত্যাদি বায়ুদূষণ করছে। এই বায়ুদূষণ শুধু আমাজন বা পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য নয়, এটি একটি ট্রান্সবাউন্ডারি বা আন্তর্জাতিক সমস্যায় রূপ নেবে। আর এতে বাংলাদেশের ওপরও এর প্রভাব পড়বে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ ইফেক্টস ইন্সটিটিউট এবং ইন্সটিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে ‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০১৯’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুদূষণে মৃত্যুর সংখ্যায় বিশ্বের নয়টি দেশের মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

সে ক্ষেত্রে যদি আমাজনের অগ্নিকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশে বায়ুদূষণ বাড়ে, তাতে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব আরও বেশি বেড়ে যাবে।

বায়ুতে মিশে থাকা এসব দূষক গ্যাস আবার এসিড বৃষ্টির জন্য দায়ী, যা প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply