‘আমার দাদাভাই’ – নুরুল ইসলামকে নিয়ে নাতি মুহিবের স্মৃতিচারণ

আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। আমার দাদাভাই ও আমাদের পরিবারের অভিভাবক। পৃথিবীর সমস্ত কৃত্রিমতার উর্ধ্বে পরিবারের জন্য অকৃত্রিম ও অনন্য সুন্দর এক ভালোবাসার অনুভূতিকে লালন করা মানুষ ছিলেন আমার দাদাভাই। সমস্ত প্রতিকূলতায় আমাদের পরিবার যাঁর কাছে ছুটে যেত, আশ্রয় খুঁজত, নিরাপদ অনুভব করত সেই মহীরুহ আমার দাদাভাই। চাওয়া পাওয়া ভুলে আমৃত্যু পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব পালনে সংগ্রাম করেছেন যিনি, সেই লড়াকু ব্যক্তি আমার দাদাভাই মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। জন্মলগ্ন থেকে আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য যার মাঝে মানুষের মত মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছে সেই সত্ত্বা আমার দাদাভাই।

দাদাভাই বহুগুণের অধিকারী ছিলেন। জনপ্রতিনিধিত্ব, শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা জীবদ্দশায় বহু কর্মে, সাধনায় নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন। সরকারি অনুমোদিত কক্সবাজারের প্রথম সাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক কক্সবাজারের মাধ্যমে কক্সবাজারে সংবাদপত্রের সূচনা করেছিলেন তিনি, যা কালক্রমে জন্ম দেয় কক্সবাজারের প্রথম সরকার অনুমোদিত দৈনিক পত্রিকা, দৈনিক কক্সবাজারকে। কিন্তু সাংবাদিকতাকে কেবল ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠানে আবদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন না এই মানুষ গড়ার কারিগর। তাই একদিকে যেমন নিজ প্রতিষ্ঠান দিয়ে গড়েছেন এই কক্সবাজারের সাংবাদিকতার আজকের কর্ণধারদের তেমনিভাবে প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন কক্সবাজারের প্রেস জগতকে এই জনপদের অধিবাসীদের জন্য কল্যাণমুখী ও জবাবদিহিতামূলক করতে। তাঁর কর্মসাধনার সুফল তাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ভোগ করে যাচ্ছে, যাবে।

আমি আমার দাদাভাইকে জীবদ্দশায় দেখেছি সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে আমৃত্যু লালন করে যাওয়া এক ত্যাগী রাজনৈতিক হিসেবে ও আমাদের পরিবারের অভিবাবক হিসেবে। কিন্তু আজ যখন তাঁকে নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছি তখন আমি যেন তার সব ভূমিকাকে গুলিয়ে কেবল আমার দাদাভাইকেই মনে করতে পারছি। আমার জীবনে যাঁর অবদান অনন্য-অতুলনীয়, কোন মাপকাঠিতেই যেটার পরিমাপ হয় না।

ছোট থেকেই আমার শিক্ষাজীবন চট্টগ্রামে। ঈদ কিংবা অন্যান্য ছুটিতে যখন কক্সবাজার আসতাম তখন দাদাভাই আমাকে নিয়ে বের হতেন। কখনো দোকানে নিয়ে ব্যাট-বল কিনে দিতেন, কখনো পত্রিকা অফিসে নিয়ে যেতেন, কখনওবা নিয়ে যেতেন সৈকতে। দাদাভাই স্মৃতিগুলোর ছবি রাখতেন সবসময়। তখনও তো এন্ড্রয়েড মোবাইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজকের মতো সর্বজনীন হয়নি, তাই দাদাভাই ক্যামেরাতে ছবি তুলিয়ে সেগুলোকে বাঁধাই করে রাখতেন। দাদাভাই সবসময় যুগের অগ্রপথিক ছিলেন। তাই প্রতিটি ছবির নিচে থাকতো ক্যাপশন, যেমনটা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চর্চিত হয়।

অশীতিপরায়ন হয়েও দাদাভাই নিয়মিত অফিস-প্রেস ক্লাবে যেতেন। জেলা আওয়ামী লীগের কোন মিটিং; বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সাংস্কৃতিক অঙ্গন সংশ্লিষ্ট যেকোন অনুষ্ঠানে এই দক্ষ সংগঠক ছিলেন পরিচিত মুখ। এরপর নানা অসুখ দাদাভাইকে দুর্বল করতে থাকলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে হত। এক পর্যায়ে তাকে চট্টগ্রামেই স্থানান্তর করতে হয় অসুস্থ শরীরে বারবার যাতায়াতের অসুবিধার কারণে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে আমি ততদিনে কলেজে। উচ্চমাধ্যমিকে যখন সরকারি সিটি কলেজে ভর্তি হই তার পরপর আমি দাদাভাই এর সাথে সাক্ষাৎ করি। দাদাভাই সরকারি নাইট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন যা বর্তমানে সিটি কলেজের অংশ। ছাত্র হিসেবে দাদাভাই এর রাজনৈতিক জীবনে এই কলেজের অনেক স্মৃতি। দাদাভাই সবকিছু নিয়ে অনেক সোজাসাপ্টা কথা বলতেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কলেজে কি রাজনীতিতে যুক্ত হব কিনা। আমি এই বিষয়ে অনিশ্চিত ও অনিচ্ছুক ছিলাম। তাই বললাম, রাজনীতির কথা তো ভাবিনি, তবে পড়াশোনার পাশাপাশি বিতর্কচর্চায় জড়িত থাকতে ইচ্ছুক আমি।

উচ্চমাধ্যমিক শেষ হলে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে এমন এক পর্যায় আসে যখন তার একাডেমিক জীবনের নিয়তি নির্ধারিত হয়। আমার শিক্ষাজীবনের বাকি সব পর্যায়ের মতো এই ক্ষেত্রেও দাদাভাই এর অবদান অনস্বীকার্য। দাদাভাইয়ের ইচ্ছা ছিল তাঁর নাতি ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে। পরবর্তীতে আমি চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হই, যেখানে অদ্যবধি অধ্যয়নরত আছি।

কিছুদিন পূর্বে আমি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে বাসায় আইসোলেশনে ছিলাম। দাদাভাই এর কিছুদিনের মাঝে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সেই হাসপাতাল থেকেই তিনি প্রত্যেকটা দিন ফোন করে খোঁজ নিতেন কেমন আছি, স্বাস্থ্য ঠিকাছে কিনা। তাঁর এই ভালোবাসার প্রতিদান পৃথিবীর সমস্ত প্রাচুর্য দিয়েও কি দেয়া সম্ভব?

যাঁরা অন্যের জীবন গড়াকে জীবনের সংকল্প বানিয়ে নেন, তাঁরা সেই জীবনগুলোর মধ্যে বেঁচে থাকেন। আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার মানুষ, আমার দাদাভাই ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ তারিখে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছায় আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অনাদি আখিরাতের জীবনে। কিন্তু তাঁর কর্মসাধনা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, তাঁর অবদানে মুখরিত থাকবে আমাদের পরিবার ও এই কক্সবাজারের জনপদ। রহমানুর রাহীম মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, যেন তিনি আমার দাদাভাইয়ের সমস্ত ভুল-ত্রুটিকে রহমতের চাদরে ঢেকে দিয়ে তাকে দাখিল করেন জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান জান্নাতুল ফেরদৌসে। সেইসাথে রাব্বুল আলামীন যেন তাঁর পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মকে সামর্থ্য দেন তাঁর কর্মসাধনাকে অনুপ্রেরণা বানিয়ে সারাজীবন মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে।

লেখক পরিচিতিঃ

মোঃ মুহিবুল ইসলাম
(মেডিকেল শিক্ষার্থী ও নুরুল ইসলামের বড় ছেলে মুজিবুল ইসলামের বড় ছেলে)

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply