ইতিহাসের ৫ কুখ্যাত নারী সিরিয়াল কিলার

জিয়া উদ্দিন কোম্পানী, কক্সবাজার:

নারী যদি হয়ে উঠে হিংস্র বা কুখ্যাত কোন খুনি, তাহলে স্বভাবতই আমাদের মনে সেগুলো ভয়াবহ চিত্র হিসেবেই দাগ কাটবে। এমনই কয়েকজন নারী আছেন যারা এখন পর্যন্ত বেশ সমালোচিত তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে, যাদেরকে ধরা হয় সিরিয়াল কিলার হিসেবে, যারা কুখ্যাত নারী হিসেবেই বিশ্বে পরিচিত। তাদের মধ্যে ৪ জন সম্বন্ধে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো।

ক্যাথরিন নাইট

১. ক্যাথরিন নাইট :

বিশ্বের ইতিহাসে ভয়ঙ্করতম একজন নারী হিসেবেই গণ্য করা হয় অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণকারী নারী ক্যাথরিন নাইটকে, যাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় মৃত্যুর বিধান না থাকায়। তার বাবাও ছিলেন একজন মদ্যপ। প্রকাশ্য তিনি তার স্ত্রীকে দিনে ১০ বার পর্যন্ত ধর্ষণ করেছিলেন। বাবার মতো অন্যায়ের পথে মেয়েও নেমেছিলেন। ক্যাথরিন তার প্রথম স্বামীর দাঁত উপড়ে ফেলার পর তার হিংস্রতার প্রমাণ আসতে শুরু করে। যখন দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয় তখন তিনি তার স্বামীর আট সপ্তাহ বয়সী একটি কুকুরের জিহ্বা কেটে নেন এবং পরে কুকুরের চোখ তুলে ফেলেন। কয়েক মাস পরে জন চার্লস প্রাইস নামে একজনের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রাইস অনেক ধন-সম্পদের মালিক ছিলেন। ক্যাথরিনের হিংস্রতা সম্বন্ধে আগে থেকেই প্রাইস অবহিত ছিলেন। প্রাইসের সঙ্গে সম্পর্কের কিছু দিনের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এই ক্যাথরিন। একপর্যায়ে ক্যাথরিন ৩৭ বার ছুরিকাঘাতে প্রাইসকে হত্যা করে। এরপর প্রাইসের মৃতদেহের চামড়া ছাড়িয়ে বেডরুমের দরজার পেছনের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে। শুধু তাই নয়, প্রাইসের মৃতদেহ থেকে মাথা কেটে নিয়ে সেটা দিয়ে স্যুপ রান্না করে বাচ্চাদের জন্য রেখে বাইরে চলে যান ক্যাথরিন। কিন্তু বাচ্চারা বাড়ি ফেরার আগেই পুলিশ এসে হতভাগ্য প্রাইসের মরদেহ উদ্ধার করে। তখন মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় তাকে প্যারল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

এলিজাবেথ বিটোরি

২. এলিজাবেথ বিটোরি :

এলিজাবেথ বিটোরিকে ধরা হয় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার। যদিও তার খুনের সংখ্যা সঠিক ভাবে জানা যায়নি, তবু ইতিহাসে এলিজাবেথকে রক্তপিপাসু পিশাচিনী বলা হয়। তিনি ব্লাড কাউন্টেস নামেও অধিক পরিচিত। এলিজাবেথ বিটোরি ছিলেন একজন হাঙ্গেরিয়ান নারী। জন্ম ১৫৬০ সালের ৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিটোরি পরিবারে। পিতা জর্জ বিটোরি। তিনি ছিলেন স্টিফেন বিটোরির ভাই। এই স্টিফেন বিটোরি ছিলেন একাধারে একজন নবেল লরিয়েট, কিং অব পোল্যান্ড এবং ডিউক অব ট্রান্সেলভানি। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও কৃতকর্মের কারণে ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত রমণী হিসেবে ঘৃণার চোখে দেখা হয় এলিজাবেথকে। ফ্রান্স নোডিজডের সঙ্গে ১৫৭৫ সালের ৮ই মে এই এলিজাবেথ বিটোরির বিয়ে হয়। এলিজাবেথের স্বামী ১৫৭৮ সালে হাঙ্গেরির সেনাপতি নিযুক্ত হন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে ব্যবসা ও শাসন কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন এলিজাবেথ। তখন থেকেই চড়া বেতনে এলিজাবেথের ওখানে কাজ করত কুমারী গৃহকর্মী। ধারণা করা হয়, এলিজাবেথ খুন করেছেন ৬৪০-এরও বেশি কুমারীকে। যেসব কুমারী মেয়ে এলিজাবেথের ওখানে কাজ করতে যেত তারা আর ফিরে আসতে পারতো না বলেই জানা গেছে। এমনটাও শোনা যেত, এলিজাবেথ কুমারী ওইসব নারীকে হত্যা করতো, তাদের রক্তে গোসল করতো। তাদের চিৎকারে এলিজাবেথ উল্লাস করতো। অবশেষে সামাজিক অবস্থানের জন্য তার বিচার না হলেও বাকি জীবন গৃহবন্দি করে রাখা হয় এলিজাবেথকে। ১৬১৪ সালে চার বছরের গৃহবন্দি অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।

রোজমেরি পাউলিন রোজ ওয়েস্ট

৩. রোজমেরি পাউলিন রোজ ওয়েস্ট:

১৯৫৩ সালে জন্ম নেয়া একজন বৃটিশ সিরিয়াল কিলার, যিনি রোজ নামে পরিচিত। রোজের বাবা ছিলেন একজন সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত। রোজের বয়স যখন ১৬ তখন থেকে বাবা তার ওপর চরমভাবে এবং প্রতিনিয়তই যৌন নির্যাতন চালাত। অন্যদিকে রোজের হিংস্রতাও ছিল মাত্রাতিরিক্ত। তার নৃশংসতার হাত থেকে নিজের কন্যা পর্যন্ত রেহাই পায়নি। তার ভয়ঙ্কর কীর্তিকলাপের জন্য ব্রিটেনের ২৫ গ্লুচেস্টার ক্রওয়েলের বাড়িটি হাউস অব হরর নামে পরিচিত। এই সিরিয়াল কিলার মহিলার স্বামীও তাকে কিলিংয়ের কাজে সহযোগিতা করতো। দুজনকেই পরবর্তীতে মানসিকভাবে বিকৃত হিসেবে অভিহিত করা হয়। রাতের অন্ধকারে শিকারের সন্ধানে বের হতেন রোজ। তারপর সুন্দর স্বাস্থ্যবান কোন ছেলেকে ধরে বাসায় নিয়ে আসতেন। প্রথমে ছেলেটি যৌন নিপীড়নের শিকার হতো রোজ এবং তার স্বামীর হাতে। এরপর ছেলেটিকে খুন করত তারা। ধারণা করা হয়, মানসিক বিকারগ্রস্ত রোজের হাতে ১২টিরও বেশি খুন হয়েছে।

ইলসে কোচ

৪. ইলসে কোচ:

পরিচিত বুচেনউডের ডাইনি হিসেবে। আসল নাম ইলসে কোচ। ১৯০৬ সালে জার্মানিতে এক কারখানা শ্রমিকের ঘরে জন্ম নেয়া ইলসে কোচের মৃত্যু হয় ১৯৬৭ সালে। ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম নারী হিসেবে কোচের অবস্থানও শীর্ষে। বুচেনউডের কনসানট্রেশন ক্যাম্পের কমানড্যান্ট কার্ল কোচের স্ত্রী ছিলেন এই ইলসে কোচ। স্বামীর ক্ষমতা ছাড়াও কোচ নিজে ক্যাম্পের সুপারভাইজরের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আর এই সুবিধা নিয়েই নিজের ভয়ঙ্কর ও বিকৃত ইচ্ছা চরিতার্থ করা শুরু করেন কোচ। প্রথমে বন্দিদের মধ্য থেকে বাছাই করে বিভিন্নজনের গায়ে ট্যাটু আঁকা হতো। আর যাদের শরীরে ট্যাটু আঁকা থাকত তাদের হত্যা করে ট্যাটুটি চামড়াসহ কেটে সংরক্ষণ করতেন কোচ। সেই সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গও সংগ্রহ করতেন। তবে কোচের সবচেয়ে প্রিয় ও বিকৃত শখ ছিল সুন্দর চামড়াওয়ালা বন্দিদের হত্যা করে তাদের শরীরের চামড়া দিয়ে কুশন কভার, সাইড ল্যাম্প, বালিশের কভারসহ বিভিন্ন জিনিস বানানো। ভয়ঙ্কর এই নারীকে ১৯৪৩ সালে গ্রেপ্তার করা হলেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে জায়গা পরিবর্তন করলেও দুই বছর পর আবারও আমেরিকান সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। তার কুকীর্তি এক এক করে প্রমাণ হয়। ১৯৪৭ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। এর ২০ বছর পর জেলে থাকা অবস্থাতেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন বুচেনউডের ডাইনি ইলসে কোচ।

মেরি এন কটন

৫. মেরি এন কটন:

ব্রিটেনের প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার মেরি এন কটন ১৮৩২ সালে ডার্হাম কাউন্টির ল’মোর্সলে অঞ্চলে জন্মগ্রহন করেন। ২০ বছর বয়সে উইলিয়াম মউব্রের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ডেবনের প্লেমাউথ অঞ্চলে সংসার শুরু করেন। এই দম্পতি ৫ সন্তানের জন্ম দেয় যাদের মধ্যে ৪ জনই মারা যায়। উত্তর পশ্চিমের দিকে সরে গেলেও দুঃখ তাদের পিছু ছাড়ল না। সন্তানদের পিছু পিছু উইলিয়ামও মারা যায় ১৮৬৫ সালে।
তার অবশিষ্ট দুই সন্তানের একজন ও তার ২য় স্বামী জর্জও একই রোগে মারা যায়। তারপর তার পরবর্তী সময়ে তার আরও বার সন্তান, তিন স্বামী এক বন্ধু, এক প্রেমিক সকলেই একই রোগ অর্থাৎ পাকস্থলীর প্রদাহজনিত জ্বরে মারা যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় সাংবাদিকরা আবিস্কার করে সকলকে সে আর্সেনিক বিষ খাইয়ে হত্যা করেছে এবং এই অপরাধে ২৪ মার্চ ১৮৭৩ সালে তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply