কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম

পর্যটন নগরী কক্সবাজার পৌরসভার বাসিন্দাদের জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে নেওয়া ‘কক্সবাজার শহরে ভূ-উপরস্থ পানি শোধনাগার স্থাপন’ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। আদালতে চলমান স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই নিয়ম না মেনে প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণের টাকা হস্তান্তর করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৭ শতাংশ জমির জন্য সোয়া ৭ কোটি টাকার বেশি হস্তান্তরিত হয়েছে। করোনা প্রাদুর্ভারের মধ্যেও দ্রুত হস্তান্তর করা হয়েছে এসব টাকা। প্রকল্প নেওয়ার অল্প কিছুদিন আগে পৌরসভার মেয়রের স্ত্রী ও শ্যালকের নামেই নেওয়া হয়েছে ওইসব জমি। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ। ইতোমধ্যে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পটিকে প্রধানমন্ত্রীর ‘স্বপ্নের প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বাস্তবায়নকারী সংস্থা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ঋত্বিক চৌধুরী আজাদীকে বলেন, কক্সবাজার শহরে সাধারণ মানুষের লবণাক্ততামুক্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থার জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প। ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। আমরা দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করব। প্রকল্পটি শেষ করতে সকলের সহযোগিতা চাই।
জানা যায়, ২০১৭ সালে ‘কক্সবাজার শহরে ভূ-উপরস্থ পানি শোধনাগার স্থাপন’ প্রকল্পটি হাতে নেয় কক্সবাজার পৌরসভা। পরে প্রকল্পটিতে এশিয়ান ডেভেলপম্যান্ট ব্যাংক অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে প্রায় শত কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রাথমিক পর্যায়ে কক্সবাজার পৌরসভার জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হলেও পর্যায়ক্রমে জেলার অন্য উপজেলাগুলোতে সুপেয় পানি সরবরাহ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরোদমে বাস্তবায়িত হলে দৈনিক ১০ লাখ লিটার সুপেয় পানি পাওয়া যাবে প্রকল্পটি থেকে। এদিকে অনিয়মের শুরু ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে পৌর নির্বাচনের পর থেকে। প্রকল্পের জন্য জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে (এলএ মামলা ৪-২০১৯-২০ মূলে) ২.১৭৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এজন্য জেলা প্রশাসনকে প্রকল্পের প্রায় ৩৬ কোটি টাকা হস্তান্তর করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
সূত্রে জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট পৌর মেয়র হিসেবে শপথ নেন। এরপর পানি শোধনাগার স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত জায়গাগুলো প্রভাব খাটিয়ে নিজের স্ত্রী ফারহানা আক্তার ও শ্যালক মিজানুর রহমানের নামে কিনে নেন। তবে প্রস্তাবিত ওই জায়গা নিয়ে ১৯৮৬ সাল থেকে কয়েক পক্ষের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে হিস্যা সংক্রান্ত মামলা (৫২/৮৬) চলে আসছিল। অভিযোগ উঠেছে, জমি ক্রয়, নামজারি, অধিগ্রহণসহ পুরো প্রক্রিয়া হয়েছে দ্রুততার সাথে। জমি কেনার রেজিস্ট্রেশন থেকে নামজারি, সর্বশেষ এলএ ক্ষতিপূরণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ জুলাই দুই দাগের ৪৭ শতাংশ জমির অধিগ্রহণের বিপরীতে দুই চেকে ৭ কোটি ১৬ লাখ ৮৯ হাজার ৭৯৪ টাকা মিজানুর রহমানকে প্রদান করেছে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা। অথচ আইনজ্ঞরা বলছেন, স্থায়ী ও স্থাবর সম্পত্তির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো মামলা দেওয়ানি আদালতে চলমান থাকলে সরকারি প্রকল্পের জন্য ওই জমি অধিগ্রহণ হলেও এলএ মামলা নিষ্পত্তি করা যায় না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিজানুর রহমানকে চেক দুটি অধিগ্রহণ শাখা কিংবা প্রকল্প স্থানে প্রদান করা হয়নি। হিলটপ সার্কিট হাউজে নিয়ে গিয়ে চেক দুটি প্রদান করেন এলএ কর্মকর্তা মো. শামীম হুসাইন। এসময় চেকগ্রহীতাকে শনাক্ত করেন মেয়র মুজিবুর রহমান নিজেই। চেক দুটি যাচাই করে দেখা যায়, চেক দুটিতে চলতি বছরের ৯ জুলাই স্বাক্ষর করেন এলএ কর্মকর্তা মো. শামীম হুসাইন। ওইদিনই চেক দুটির গ্রহণকারীকে শনাক্তকারী হিসেবে এলএ চেকে স্বাক্ষর করেন মেয়র মুজিবুর রহমান। প্রাপক মিজানুর রহমান স্বাক্ষর করেন ১১ জুলাই। স্থান লেখা হয় ‘হিলটপ সার্কিট হাউজ’। আবার এলএ শাখার চেক প্রদানের রেজিস্ট্রারে প্রদানের তারিখ লেখা হয় ১৫ জুলাই। অধিগ্রহণকৃত প্রতি গণ্ডা (দুই শতক) জমির মূল্য পড়েছে ৩০ লাখ ৮১ হাজার ৪৪৪ টাকা করে।
এদিকে চেক দুটি হস্তান্তরের পর অনিয়মের বিষয়টি দুদকের নজরে আসে। এরপর অনুসন্ধান শুরু হলে মেয়রের স্ত্রীর নামের অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণের চেকগুলো হস্তান্তর করা থেকে বিরত থাকে এলএ শাখা। এসব চেকের পরিমাণ ২৮ কোটি টাকার বেশি। অনুসন্ধানে নেমে দুদক জানতে পারে, অনিয়মের মাধ্যমে মেয়র নিজের স্ত্রী ও শ্যালকের নামে প্রকল্পের জমি কিনে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। জমির দামও দেখানো হয়েছে অপ্রত্যাশিত। আবার জমির মূল মালিকদের নামে ৮ ধারার নোটিশ জারি হলেও ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করা হয়েছে অন্যজনকে।
স্থানীয় ঝিলংঝা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান আজাদীকে বলেন, পানি শোধনাগার প্রকল্পটি পৌরসভার জন্য করা হচ্ছে। ওখানকার জমিগুলো প্রতি কানি (৪০ শতক) বর্তমানে এক কোটি থেকে এক কোটি দশ-বিশ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সাবেক এক জনপ্রতিনিধি আজাদীকে বলেন, ঝিলংঝা মৌজার যেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেখানে গণ্ডা দুই লাখ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না।
এদিকে জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে জমির মালিকদের ৪ ধারার নোটিশ জারি করলে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী এলএ শাখায় লিখিত অভিযোগ দেন। এরপর জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত ওই নথিতে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর তারিখের নোটিংয়ে উল্লেখ করা হয়, ‘কক্সবাজার শহরে ভূ-উপরস্থ পানি শোধনাগার স্থাপন প্রকল্পের জন্য সর্বশেষ জ্ঞাত মালিকদের ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই তারিখে ৪(১) ধারার নোটিশ প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ৪টি আবেদন (অভিযোগ) পাওয়া যায়। তন্মধ্যে একটি অভিযোগের বর্ণিত জমিতে বহুপক্ষীয় স্বত্ব থাকায় অপর ৫২/৮৬ নং মামলা বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে (১ম) চলমান। উক্ত মামলা চলমান থাকায় বর্ণিত জমি ব্যবস্থাপনার জন্য ০৩/৮৮-৮৯ নং রিসিভার মামলাক্রম রিসিভারের মাধ্যমে সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা হয় বিধায় অধিগ্রহণ না করার আবেদন জানান।’ জেলা প্রশাসকের এই নোটের পর প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ ও এলএ মামলা নিষ্পত্তি করে কক্সবাজার এলএ শাখা।
প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের অনিয়মের বিষয়ে চট্টগ্রামে দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাজী ছানোয়ার আহমেদ লাভলু আজাদীকে বলেন, শুধুমাত্র দুদক নয়, যেকোনো ক্ষেত্রে স্থায়ী এবং স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্তে কোনো দেওয়ানি মামলা অথবা দেওয়ানি মামলা সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলা বা খতিয়ান সংশোধন সংক্রান্ত কোনো মামলা অনিষ্পন্ন থাকলে এবং কারো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কোনো মামলা থাকলে সেক্ষেত্রে এলএ মামলা নিষ্পত্তি করা যায় না। ওইখানে (কক্সবাজারে) এলএ শাখা যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। পুরো খতিয়ানটিই মামলাভুক্ত। ডিসপোটেড জায়গা নিয়ে এলএ শাখার যেকোনো সিদ্ধান্ত অবৈধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারজনিত অপরাধ বলে গণ্য হবে।
আদালতে খতিয়ানের হিস্যা জটিলতা মামলা (গোলাভাগ মামলা) নিষ্পত্তি না হওয়া অবস্থায় সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের জায়গার নতুন নামজারির বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ শাহরিয়ার মোক্তার আজাদীকে বলেন, মামলায় আদালতের স্থগিতাদেশ না থাকলে এবং দখল সংক্রান্ত কোনো জটিলতা না থাকলে যেকোনো জমির নামজারি দেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে সৃজিত দলিলের জমির চৌহদ্দি উল্লেখ করা থাকে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো সাব-রেজিস্ট্রার অফিস বলতে পারবে।
প্রকল্পটিতে এলএ মামলা নিষ্পত্তি ও চেক প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল কক্সবাজার এলএ শাখার ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো. শামীম হুসাইন ‘এ বিষয়ে সিনিয়র কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কথা বলা যাবে না’ বলে লাইন কেটে দেন।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমানের মুঠোফোনে গত কয়েকদিন ধরে ফোন করা হয়। তবে মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়ায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। মেয়র মুজিবুর রহমানের শ্যালক মিজানুর রহমান দুই চেকের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের সোয়া ৭ কোটি টাকা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে আজাদীকে বলেন, ২০১৮ সালের আগে নিয়ম মেনে ওই খতিয়ানের জমি কিনেছি। কখন নামজারি হয়েছে সে তারিখ খেয়াল নেই। যথাযথ নিয়ম মেনে রেজিস্ট্রি অফিস রেজিস্ট্রি করেছে, এসি ল্যান্ড অফিস নামজারি দিয়েছে, এলএ শাখা টাকা (অধিগ্রহণের টাকা) দিয়েছে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন গতকাল আজাদীকে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো এলএ (অধিগ্রহণ শাখা) পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। ওই প্রকল্পের অধিগ্রহণকৃত জমির এলএ মামলা আইনগতভাবেই নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে। তারপরও কোনো অভিযোগ থাকলে এলএ মামলার টাকা আইনিভাবে রিকভারি (ফেরত) করার সুযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, কক্সবাজার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। প্রত্যাশী সংস্থার মেয়র মুজিবুর রহমান যোগসাজশ করেই নিজের স্ত্রী ও শ্যালকের নামে জমি কিনে প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করে দুর্নীতি করেছেন। এখানে সরকারি অর্থের নয়ছয় হয়েছে।

  • দৈনিক আজাদী নিউজ
Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply