কক্সবাজার পৌর কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিনের বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও ইয়াবা ব্যবসা

কক্সবাজার পৌরসভার কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ খোদ ক্ষমতাসীন দলের। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পৌর আওয়ামী লীগ গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছিল। ইয়াবা ব্যবসার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠছেন তিনি।

কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিনের কাছে পাথর ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও নিরীহ ব্যক্তি জিম্মি হয়ে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে পুলিশ সুপার সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েও চাঁদাবাজি থেকে রেহায় মিলছে না কারোরই। উল্টো ভুক্তভোগীদের মুখ খুললে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন সাহাব উদ্দিন ও তার বাহিনী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবার, নারী কেলেঙ্কারী সহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আছে। কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগ সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারের অভিযোগ তুলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে দলের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেয়। কিন্তু সাহাব উদ্দিনের অপকর্মে বিন্দু পরিমাণ ভাটা পড়েনি। উল্টো দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, বাঁকখালী নদীতে সাহাব উদ্দিনের নিয়মিত ইয়াবার চালান খালাস হয়। নিরাপদে ইয়াবার চালান খালাস করতে বাঁকখালী নদীতে সিসিটিভিও স্থাপন করেছিলেন তিনি। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসলে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রভাবশালীর নেতার প্রশ্রয়ে থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাথর ব্যবসার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ফখর উদ্দিন আলী আহাম্মদ’ কোম্পানী কক্সবাজার শহরের আলীর জাহাল গোদারপাড়া এলাকায় জমি ভাড়া নিয়ে পাথরের ডায়েক করে। সেখান থেকে পাথরগুলো বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন কাজে বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি।

ওই প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ জুলাই ‘মেসার্স ফখর উদ্দিন আলী আহাম্মদ’ কোম্পানীর ডায়েক থেকে বাকিতে ৩ হাজার ৪৫ সিএফটি পাথর ক্রয় করেন সাহাব উদ্দিন। ওই পাথরের মূল্য ৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। পাথর নেওয়ার পর থেকে একাধিকবার তার (সাহাব উদ্দিন) সাথে যোগাযোগ করা হলেও নানা তালবাহনা করে পাওনা টাকা পরিশোধ করেনি।

পাওনা টাকা পরিশোধ না করে গত ১ সেপ্টেম্বর আবারও ওই কোম্পানীর কাছ থেকে ২ হাজার সিএফটি পাথর কেনা চান তিনি। কিন্তু আগের বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় কাউন্সিলরকে পাথর দেয়নি ‘মেসার্স ফখর উদ্দিন আলী আহাম্মদ’ কোম্পানী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন কাউন্সিলর। ওই ডায়েক থেকে ট্রাক যোগে কনস্ট্রাকশন কাজে পাথর সরবরাহ করার সময় বাঁধা দেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে কথা বলেন কোম্পানীর জিএম তোফায়েল আহমেদ পাাটোয়ারী।

কোম্পানী সূত্র জানায়, ৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০ টার দিকে কোম্পানীর পাথর বোঝাই তিনটি ট্রাক বের হওয়া সময় সাহাব উদ্দিন তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আটকে দেন। একটি পাথরও সরাতে না দেয়ার হুমকি দেন। মারধরের হুমকি ধমকি দিয়ে ওই তিন ট্রাক পাথর কাউন্সিলর তার নিজের জমিতে নিয়ে যান। এরপর মূল ডায়েক থেকে আরও ২ হাজারেরও অধিক সিএফটি পাথর সরিয়ে রাখেন।

এঘটনার পর কোম্পানীর পক্ষ থেকে পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ করা হয়। অভিযোগের পর কাউন্সিলরের সাথে আপোষনামা হয়। ওই আপোষনামায় পাথর নিয়ে যেতে দিতে রাজি হন তিনি। কিন্তু মাস পার হতে না হতে আবারও চাঁদার ফাঁদ বসান কাউন্সিলর।

গত ৮ ও ৯ অক্টোবর পাথর সরানোর সময় কাউন্সিলর সরাসরি হামলা চালান। এতে অংশ নেয় তার বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড বক্কর ও এরফানের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী। হামলায় ব্যাপক তা-ব চালায় তারা। এরপর থেকে একটি পাথরও সরলে লাশ পড়ার হুমকি দেন।

কোম্পানীর প্রতিনিধি সুফি আহমেদ জানান, কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিন বর্তমানে ২০ লাখ টাকার পাথর জিম্মি করে রেখেছেন। এর আগেও প্রায় ১০ লাখ টাকার পাথর নিয়ে গিয়ে টাকা দেননি। কোথাও অভিযোগ করেও রেহায় মিলছে না।

অভিযোগের বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যা ইচ্ছে লিখুন। এসব দেখার টাইম নাই।’

জানা গেছে, বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় একটি ছিনতাইকারী চক্র আছে। ওই চক্রকে শেল্টার দেয় সাহাব উদ্দিন। চক্রটি বাসটার্মিনাল কেন্দ্রিক ইয়াবা ছিনতাই করে। ছিনতাইয়ের পাশাপাশি তারা ইয়াবা কারবারও চালিয়ে যায়। এই চক্রের কেউ গ্রেপ্তার হলে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেন কাউন্সিলর।
সূত্রমতে, বিভিন্ন দোকান থেকে বাজার করার পর নিজেকে কাউন্সিলর পরিচয় দিয়ে পণ্যসামগ্রীর টাকা দেন না তিনি। করোনাকালে ত্রাণ সামগ্রি দেওয়ার কথা বলে দুটি দোকান থেকে বাজার করেন। এরমধ্যে একজনের কাছ থেকে ১১ লাখ টাকার ভোগপন্য নেয়। বাহার অটো রাইস মিল থেকে ১৪ লাখ ৮ হাজার ৯২২ টাকার চাউল নেয়। ওই অটো রাইস মিলের মালিক ছালামত উল্লাহ বলেন, পাওনা টাকা চাইতে একাধিকার লাঞ্চনার শিকার হয়েছেন। কিন্তু কোন টাকা দেননি। পরে সেই টাকা দাবী করলে ওই দুই ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন হুমকি ধমকি দেয়। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেয়।

স্থানীয়রা জানান, আলিরজাহাল এলাকায় বিভিন্ন ভাড়া বাসায় তার নিয়ন্ত্রণে শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবারকে ভাড়া বাসা নিয়ে দিয়েছেন। এসব ভাড়া বাসায় উঠা রোহিঙ্গা নারীদের ব্যবহার করে ইয়াবার চালান পাচার করে সাহাব উদ্দিন। তাদেরকে দিয়ে টেকনাফ এবং উখিয়া থেকেও ইয়াবার চালান সংগ্রহ করেন তিনি।

আলিরজাহাল এলাকায় বিভিন্ন স্পটে শতাধিক কিশোর রয়েছে। এরমধ্যে রোহিঙ্গাও আছে। তাদেরকে ব্যবহার করে খুচরা ইয়াবা বিক্রি করে সাহাব উদ্দিন।

৫ নং ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় বিরোধপূর্ণ জমির দখল-বেদখলে নেতৃত্ব দেন কাউন্সিলর সাহাব উদ্দিন। এই দখল-বেদখ ও মাদক কারবারে নেতৃত্ব দিতে তার একটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। ওই বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্বপালন করে বক্কর। তাদের অবৈধ অস্ত্রও রয়েছে।
মোটা অংকের টাকা নিয়ে নিরীহ লোকজনকে এলাকা ছাড়া করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জমি দখলে নিয়ে দেন তিনি।

৫ ওয়ার্ড এলাকায় ভবন নির্মাণ করলে সাহাব উদ্দিনের কাছ থেকে পারমিশন নিতে হয়। কথিত এই পারমিশন মূলত চাঁদাবাজির ফাঁদ। এই ফাঁদে ফেলে ভবন মালিকের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা হাতিয়ে নেন তিনি। কেউ তার দাবীকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ভবন নির্মাণে বাঁধা দেন। এমনকি এলাকা ছাড়তেও বাধ্য হয় অনেকে।

সিটি কলেজ এলাকাসহ কয়েকটি স্পটে পাহাড়সহ সরকারি জমি বিক্রি করছে সাহাব উদ্দিন। এসব এলাকায় প্রকাশ্যে কাটা হচ্ছে পাহাড়।
আলিরজাহাল এলাকায় অধিকাংশ ভাড়া বাসার মালিকদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায় করেন। বিভিন্ন ভাড়া বাসার মালিকদের জিম্মি করে রোহিঙ্গাদের রাখেন সাহাব উদ্দিন।

  • ভয়েস ওয়ার্ল্ড সংবাদ
Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply