কালারমারছড়া শান্তিপূর্ণ ভোট: ইভিএমে গোলমাল ও কারচুপির অভিযোগ

এস এম শাহরিয়া, কালারমারছড়া থেকে ফিরেঃ
দিনভর শান্তিপূর্ণ ভোট হয়ে গেল কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালী ও কালারমারছড়া ইউনিয়নে। এছাড়া উপজেলার কালারমারছড়া ইউপি নির্বাচনে নানা ভয় আর শঙ্কা থাকলেও শেষতক স্বস্তির বার্তাই দিয়ে গেল ভোট। পরিবেশ নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ না আসলেও ইভিএমের গোলযোগের ভোগান্তি ছিল দিনভর। লাইনে জটলা, ইভিএম বিকল, প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং কর্তৃক ভোটারদের সহযোগিতার নামে ভোট প্রয়োগ এমন অভিযোগ করেছেন ভোটারও চেয়ারম্যান আর মেম্বার পদের প্রার্থীরা। তার পরেও নির্বাচন চলাকালীন এর কোন সুরাহা না হয়ে অদৃশ্য কারণে নির্বাচন শেষ হয়। ইভিএমের কারচুপির বিষয়টা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে রীতিমত তুলোদুনো চলছে এখনোও। তবে সকলের অভিযোগের তীর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বিমেলেন্দু কিশোরের দিকে।
১৫ জুন সকালে ভোট শুরুর পরই গুমোট পরিবেশ রূপ নেয় বৃষ্টিতে। বাড়তে থাকে বৃষ্টি। অল্পখানিক স্বস্তির বৃষ্টি শেষে শীতল হয় পরিবেশ। একইসঙ্গে কালারমারছড়া জুড়ে পুরো বেলা ছিল শীতল ভোটের পরিবেশ। সকাল ১১টা, আর্দশ দাখিল মাদ্রাসা। কেন্দ্রে যেতে শোনা যায় এক টমটম চালক যুবকের উচ্চস্বর। অস্থায়ী ভাড়া থাকা বাসা বদরখালী থেকে ভোট দিতে নিজ এলাকায় এসেছেন আশেকুল ইসলাম। বয়স ৩৫ বছর। এসেছেন সকাল সাড়ে নয়টায়।
আশেক জানান, সকাল ৮টায় ভোট শুরু হলে ৯ টার পর ভোট কক্ষে গিয়ে স্মার্ট কার্ড দেখিয়ে ভোট দিতে পারেননি তিনি। পছন্দের প্রতীকে ভোট দিতে গেলে ভাটন চাপলে অন্য প্রতীক চলে আসার জটিলতায় বেলা ১০টায়ও ভোট দিতে এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে ভোট দিতে না পারায় উষ্মা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভোট দিতে পারবো কিনা জানি না। চেষ্টা করেছি এখানে সুক্ষ্ম কারচুপি হওয়ার বিষয়টা সন্দেহ হলে ভোট না দিয়ে চলে এসেছি।
রুখিয়া আক্তার (ছন্দনাম) বলেন, ভাইয়া আমি ভোট দিতে এসেছি। কিন্তু আমার ফিঙ্গার মিললো না। দীর্ঘ চেষ্টার পর ভোট না দিয়ে চলে আসতে হল। এখানে ইভিএমে ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছেন তার মতো অনেকেই। অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। কারও কারও আবার আঙ্গুলের ছাপ মিলছে না।
এতে উষ্মা প্রকাশ করেন অনেকে। সময় দুপুর ৩টা ৭ নং ওয়ার্ড কালারমারছড়া আর্দশ দাখিল মাদ্রাসা। শেষ মুর্হুত এসে কেন্দ্রটি তখন প্রায় ভোটার শূন্য। ভোটারদের জন্য বসে আছেন কর্মকর্তারা, পোলিং এজেন্টরাও কাটাচ্ছেন কর্মহীন সময়। পরে ভোট গ্রহণ শেষ হয়।
দুপুরে কালারমারছড়া উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, এই কেন্দ্রে সকাল থেকে কচ্ছপ গতিতে ভোট পড়েছে।
আর ভোটার উপস্থিতি সরব ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি কমছে। তবে সেখানে নৌকার এজেন্টরা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করার খবর পেয়ে টেলিফোন মার্কার চেয়ারম্যান প্রার্থী এসে রুখে দিতে চেষ্টা করলে কেন্দ্রে হৈ-চৈ শুরু হয়। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন এসে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে পরিবেশ শান্ত করে।
দুপুর দেড়টা ৬নং ওয়ার্ড নয়াপাড়া কেন্দ্রে মেলে ভিন্ন চিত্র। শত শত পুরুষ-মহিলা ভোটার দ্বিতীয় তলা ভবনের নিচে ও উপরে ভোট দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। একদিকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি অন্যদিকে ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ তারা। এখানেই আবার অভিযোগ মেলে ভোট ধীর গতির। এমন করে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এক জায়গায় আঁধঘন্টা আছি। কৃত্রিম লাইন করছে নাকি কে জানে? না হলে লাইন আগায় না কেন।
কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহিলা ভোটার বলেন, গরমে গা ঘেমে যাচ্ছে। এক ঘণ্টা গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছি, কই লাইন তো আগায় না। তাদের কোনো সিস্টেম নাই। এক দরজা দিয়েই ঢুকছে, ওই দরজা দিয়েই বের করছে। ভোটকেন্দ্রে দেখা যায়, দীর্ঘ লাইন। একজনের শরীরে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছেন আরেকজন। এই ভোট কেন্দ্রের বাইরে দেখা যায়, বিজিবি ও পুলিশ মিলে কেন্দ্রের পরিবেশ সচল রাখতে ব্যস্ত। অকারণে যারা জটলা করছেন তাদেরই তাড়িয়ে দিচ্ছেন। ধীরগতির ইভিএম নিয়ে ব্যাপক অসন্তুষ্টি দেখা দেয়। ভোটই দিতাম না, একঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়ায় আছি ফিঙ্গার ম্যাচ করে না। হাত ধুয়ে আসতে বললো আসলাম তাও মেলে না। এখন চলে যাচ্ছি এভাবেই রাগ নিয়ে বলছিলেন অনেকে। অপরদিকে ভোট চলাকালে ১নং ওয়ার্ড উত্তরনলবিলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকার সমর্থক আর টেলিফোনের সমর্থকদের মধ্যে দাওয়া পাল্টা দাওয়ার ঘটনা ঘটে।
কালারমারছড়া ৭ নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী নুরুল আলম টিপু তার ফেসবুক টাইমলাইনে ক্ষোভের সাথে লিখেছেন, প্রিসাইড়িং এবং সহকারী প্রিসাইড়িং এর কাছে অসহায়,ছিল বার বার রেজাল্ট দেখানোর জন্য বলা হইলে তা না দেখিয়ে তাদের তৈরি করা রেজাল্ট পড়িয়ে সোনানো হয় এতে সবার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। সুতরাং আপনারা প্রত্যেক মেম্বার প্রার্থীকে তাদের প্রাপ্ত সঠিক ভোট গুলো পুনরায় রিপলে করে দেখিয়ে ভোটার এবং প্রত্যেক প্রার্থীর কাছে ফেয়ার / কারচুপি বিহীন নির্বাচনের সঠিক প্রমান উপস্থাপন করুন।
অপরদিকে ভোট গণনার পর রাতে উপজেলা হলরুম থেকে বেসরকারী ফলাফল ঘোষণার পর কালারমারছড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী টেলিফোন প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী আকতারোজ্জামান বাবু মোটা অঙ্কের লেনদেনের আশ্রয় নিয়ে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে তার রেজাল্ট পাল্টিয়ে দিয়েছে বলে তাক্ষনিক সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন।
একই অভিযোগ করে ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী সাংবাদিক মোহাম্মদ হোবাইব বলেছেন, কালারমারছড়া ইউনিয়ন ৯টি ওয়ার্ড নিয়েই গঠিত। উল্লেখযোগ্য যে, মোহাম্মদ শাহ ঘোনা আমার নিজ বাড়ি এবং জাতীয়বাদ চেতনায় বিশ্বাসী আমি। আমার আত্মীয় স্বজনদের প্রায় ৭০০/৮০০শ ভোট রয়েছে ৭নং ওয়ার্ড়ে। অন্তত উক্ত ওয়ার্ড থেকে শ’খানিক ভোট পেলে ডিজিটাল কারচুপি হয়নি মনে করতাম। এই সুবাদে পাড়ায় পাড়ায় আমার স্বয়ংসম্পূর্ণ ভোট ব্যাংকের ব্যাপারে কারোরই সন্দেহ ছিল না। কিন্তু কেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কারসাজিতে আমার নির্বাচনি ফলাফল উলট-পালট করে দেওয়া হয়। আমার এজেন্টদের বুথভিত্তিক কোনো রেজাল্ট দেখানো হয়নি, প্রিন্টেড ফলাফলের পরিবর্তে আমাদের হাতে এসেছে হস্তলিখিত ফলাফল—যা সম্পূর্ণ অনধিকারচর্চা এবং গণতন্ত্রবিরোধী। ###

Leave a Reply