কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদের যত রহস্যের নাম

শিল্পের যেকোনো শাখায় একজন শিল্পী তৈরি করেন তার নিজের স্বপ্নের কোনো চরিত্র। সেই চরিত্রের পাত্রপাত্রীরা আমাদের মাঝখানে এসে যায়। প্রভাব বিস্তার করে। আমরা সাধারণ মানুষেরা সেসব চরিত্রকে অনুকরণ করি। অনুসরণ করি। পৃথিবীর সমস্ত শিল্পের অনন্য চরিত্রগুলোর মতো আমাদের বাংলা সাহিত্যে বা নাটকে তেমন কিছু চরিত্র এসেছে, যা জনপ্রিয়তায় এমন অবস্থানে, মানুষ তাদের স্থান দিয়েছে হৃদয়ের অন্যতম উজ্জ্বল অবস্থানেই। আমাদের বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদ। তিনি তাঁর গল্প, উপন্যাস ও নাটকে এমন কিছু চরিত্র তৈরি করেছেন, সেই চরিত্রগুলো যেন সারাবেলা নানানভাবে আমাদের মধ্যে বিরাজ করে। 

প্রচণ্ড রোদ নিউ মার্কেট এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে যুবক। হাতে একটি সিগারেট। আজ হরতাল। কখন একটি বাস পুড়বে সেই আগুনে সে সিগারেট ধরাবে!’ এই বিস্ময়কর তরুণটিই হলো হিমু্। ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম’ বইতে এভাবেই একটি ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা চরিত্রের একটি হচ্ছে হিমু। খালি পায়ে পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী পরে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুড়ে বেড়ায় হিমু। উদ্ভট সব কাজই তার মূল কর্মকাণ্ড। যুক্তির ধার ধারেন না। এমন সব কাণ্ড করেন যে তার আশপাশের মানুষ বরাবরই অবাক হয়ে যায়। মানুষকে চমকে দেয়াই তার কাজ। তার ওপর ক্ষিপ্ত হলেও শেষপর্যন্ত মানুষের ভালোবাসাই আদায় করে নেন এই বিচিত্র চরিত্র। 

মিসির আলি 

মিসির আলি মোটা ফ্রেমের ভারী চশমা পরিহিত লোকটি কিছুতেই বিশ্বাস করেন না অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা। যত রহস্যময় ঘটনাই ঘটুক যুক্তি দিয়ে তার সমাধান খুঁজে নেন। এই যুক্তিবাদী মানুষটির নাম ‘মিসির আলি’। হিমুর ঠিক বিপরীত। হিমু যেমন যুক্তি মানে না, মিসির আলি আবার যুক্তির বাইরে হাঁটেন না। হুমায়ূন আহমেদের তৈরি করা চরিত্রগুলোর মধ্যে ‘মিসির আলি’ই তার সবচেয়ে প্রিয়। ‘হিমু’-কে যদি অগোছালো আর যুক্তিতর্কবিরোধী চরিত্রের প্রতীক বলা হয়; মিসির আলি হচ্ছে সম্পূর্ণ তার বিপরীত। মানুষের মন, আচরণ, স্বপ্ন এবং সংকট যুক্তির আলোকে ব্যাখা করাই হলো মিসির আলির একমাত্র কাজ। 

শুভ্র 

‘শুভ্র’ চরিত্রটি তার নামের অর্থের মতোই শুদ্ধতম এক মানবের প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটেছে। হুমায়ূন আহমেদরে চরিত্রগুলোর মধ্যে শুভ্র অন্যতম। নিজেকে পৃথিবীর যাবতীয় জটিলতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে ভাবতে চান না শুভ্র। সবসময় মোটা ফ্রেমের চশমা পড়ে বইয়ের মাঝে ডুবে থাকেন। বাবার বিপুল সম্পত্তি শুভ্রকে কখনো টানে না। শুভ্র সুন্দরের শুদ্ধতা নিয়েই বেঁচে থাকতে চান। 

বাকের ভাই 

কোনো গল্প-উপন্যাস কিংবা নাটকের চরিত্র যে বাস্তবজীবনে এভাবে দৃশ্যমান হয় তা বোধ হয় আগে কেউ দেখেনি। হুমায়ূন আহমেদই সেই বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করেন ‘বাকের ভাই’ চরিত্রের মাধ্যেমে। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় নাটক। এ নাটকে ‘বাকের ভাই’র চরিত্রে অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর। পাড়ার এক মাস্তানকে একটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসি দেয়া হয়। এরই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে শত শত মানুষ! ‘বাকের ভাই’র ফাঁসি বন্ধের দাবিতে মিছিল, সমাবেশ বিক্ষোভ হয়। নাটকের স্ক্রিপ্ট ঘুরানোর কথা বলা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত ফাঁসিই বহাল রেখেছেন নাট্যকার। ‘বাকের ভাই’র ফাঁসি হওয়ার পর কেঁদেছিলেন মানুষ। এমনকি নাট্যকারের ওপর তীব্র অভিমান থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে! নাটক জগতের সে এক বিস্ময়কর ইতিহাস ‘বাকের ভাই’ চরিত্রটি।

 রুপা 

হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি সৃষ্টি ‘রুপা’। হিমু’র মতো এক বাউন্ডুলেকে ভালোবাসে এই অসম্ভব রূপবতী মেয়েটি। সবসময় অপেক্ষা করে হিমুর পথের দিকে তাকিয়ে। হিমু ফোন দিয়ে বলে ‘রুপা আমি আসছি’। হিমুর পছন্দের আকাশি রঙের শাড়ি, চোখে কাজল দিয়ে ছাদে কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে রুপা। কিন্তু হিমু আসে না। রুপাও জানে হিমু আসবে না। কিন্তু তার পরও অসম্ভব মায়া আর ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করে। পরিণতিহীন এক প্রেম নিয়ে রুপা দাঁড়িয়ে থাকে সবসময় হিমুর পথের দিকে তাকিয়ে। 

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply