ক্ষমাপ্রার্থী রাব্বানীর চিঠি: ওদের পাশে নেই কেউ

যুগান্তরঃ

ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অতীতে কোনো দিন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। এর আগে নানা সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পার পেলেও এবার আর শেষ রক্ষা হচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেক নেতা।

দুই নেতার ধারাবাহিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন নেতা খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন দলের সভাপতি। ছাত্রলীগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাবের ফলে অনেকটা একা হয়ে গেছেন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া দায়িত্বের কারণে আওয়ামী লীগের চার নেতার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলেও কার্যত তাদের পাশে এখন কেউ নেই। কমিটি ভেঙে দেয়ার খবর শুনে শোভন-রাব্বানীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাদের বড় একটি অংশ।

এদিকে এ অবস্থায় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছেন। যা প্রধানমন্ত্রীকে পৌঁছে দিতে আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতার হাতে দিয়েছেন রাব্বানী।

ওই চিঠিতে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লিখেছেন, ‘আপনি মুখ ফিরিয়ে নিলে যাবার কোনো জায়গা নেই।’ বুধবার হাতে লেখা ওই চিঠির একটি কপি যুগান্তরের হাতে এসেছে। যেখানে তিনি নিজেদের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পাশাপাশি তাদের বিষয়ে যেসব অভিযোগ এসেছে তার মধ্যে গুরুতর তিনটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিস্তারিত লেখেন। এদিকে ছাত্রলীগের প্যাডে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে চিঠি লেখার সত্যতা স্বীকার করলেও তার কাছে পৌঁছেছে কিনা- সেই বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু জানাতে পারেননি গোলাম রাব্বানী।

গত বছরের ১১ ও ১২ মে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ছাড়াই ছাত্রলীগের ২ দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন শেষ হয়। এরপর ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শুরু থেকেই দুই নেতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দরজা সব সময় খোলা ছিল। এর ফলে অতীতের মতো আওয়ামী লীগের জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী কেউ চাইলেই ছাত্রলীগে সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ পাননি। কিন্তু শোভন-রাব্বানী এ ইতিবাচক দিকটির সদ্ব্যবহার না করে এটিকে নেতিবাচক বিষয়ে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ করেন অনেক নেতা।

ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী কমিটি দেয়ায় শোভন-রাব্বানীর প্রতি আলাদা নজর ছিল আওয়ামী লীগের সব মহলের। তারা ছাত্রলীগকে শেখ হাসিনার প্রত্যাশা অনুযায়ী ‘নতুন ধারায়’ ফিরিয়ে আনবেন এমন আশা ছিল সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। অথচ সে আশায় গুড়েবালি।

একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন তারা। সংগঠনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পহেলা বৈশাখের কনসার্টে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে পার পায়। ইতিমধ্যে গণভবনে শোভন-রাব্বানীর প্রবেশের স্থায়ী পাস স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে শোভন-রাব্বানীর পিছু ছেড়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশ।

সংগঠনের সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্পাদক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাও শোভন-রাব্বানীকে পাশ কাটিয়ে চলছেন। এমনকি ফেসবুকেও আগের মতো সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে সে ধরনের প্রচারণা নেই।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ধরনা দিয়েও ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত পাচ্ছেন না শোভন-রাব্বানী। ছাত্রলীগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চার নেতা- যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের সঙ্গে কয়েক দফা সাক্ষাৎ করেছেন তারা। তবে সেখান থেকে তেমন কোনো আশার বাণী পাননি।

এর বাইরে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় অন্তত ১০ নেতার কাছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গেছেন। সেখান থেকেও অনেকটা হতাশই হয়েই ফিরেছেন দু’জন। ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উদ্দেশে সবার একটাই কথা, ‘প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত! এখানে কারও কিছু করার নেই।’

এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মমতাময়ী নেত্রী’ সম্বোধন করে চিঠি লেখেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আপনি বিশ্বাস করে শিক্ষা-শান্তি-প্রগতির যে পবিত্র পতাকা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, তার মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট ছিলাম।

দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই চতুর্মুখী চাপ, সদ্য সাবেকদের অসহযোগিতা, নানা ষড়যন্ত্র-প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা আর আমাদের কিছু জ্ঞাত-অজ্ঞাত ভুল ইতিবাচক পরিবর্তনের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করেছে।

আমাদের দায়িত্বশীল আচরণের ব্যর্থতা ও কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির বাইরেও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, প্রিয় নেত্রী দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে আপনি পছন্দ করে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বলে আমরা একটি বিশেষ মহলের চক্ষুশূল। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে, প্রপাগান্ডা ছড়িয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। সুকৌশলে আপনার এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের কান ভারি করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

নেত্রী, আপনার সন্তানরা এতটা খারাপ নয়। আমরা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি বারবার। অনেক অব্যক্ত কথা রয়েছে যা, আপনাকে কখনও বলার সুযোগ পাইনি। বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকৃত সত্যটুকু উপস্থাপনের সুযোগ চাই।’

এরপর চিঠিতে তিনটি ধারাবাহিক অভিযোগের ব্যাখ্যা দেয়া হয়। অভিযোগ-১ উল্লেখ করে বলা হয়, ‘২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর নতুন পার্টি অফিস আপনার আবেগের ঠিকানায় আমাদের ঠাঁই দিয়েছেন। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, আপনার আমানতকে সযত্নে রেখেছি। অফিস অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা করা নিয়ে যে অভিযোগ দেয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দায়িত্বপ্রাপ্তরা চান না ছাত্রলীগ এখানে থাকুক। লোক দিয়ে বাইরে থেকে ময়লা ফেলে বাথরুম ও দেয়াল অপরিচ্ছন্ন করে, সেগুলোর ছবি তুলে আপনাকে দেখানো হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত বড় ভাই এবং ক্লিনারদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন।’

অভিযোগ-২ উল্লেখ করে চিঠিতে ২০ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে দেরি করে যাওয়া প্রসঙ্গে বলা হয়। সেখানে রাব্বানী লেখেন, ‘১৮ জুলাই আপনি দেশের বাইরে যাওয়ার আগে অনুমতি নিয়ে ১৯ তারিখ আম্মুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমি এবং সভাপতি মাদারীপুর গিয়েছিলাম। সারা রাত নির্ঘুম জার্নি আর বেশ কয়েকটি পথসভা (সর্বশেষ সকাল ৮টায় সাভারে) করে সকাল ৯টায় ফিরি। রেস্ট নিয়ে পূর্বনির্ধারিত ১২টার সম্মেলনে পৌঁছাতে আমাদের ৪০ মিনিট দেরি হয়। যা অনিচ্ছাকৃত এবং অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মাননী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পূর্বেই অবগত। সকালে ঘুম থেকে দেরিতে ওঠার বিষয়টিও অতিরঞ্জিত।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে তৃতীয় অভিযোগের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি লেখেন, ‘বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

তিনটি অভিযোগের ব্যাখ্যার পর ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখেন, ‘সবকিছুর পরেও আমাদের জ্ঞাত-অজ্ঞাত ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি বঙ্গবন্ধুকন্যা, মানবতার মা…। নিজ বদান্যতায় আমাদের ক্ষমা করে ভুলগুলো শুধরে আপনার আস্থার প্রতিদান দেয়ার সুযোগটুকু দিন। আপনি মুখ ফিরিয়ে নিলে যাবার কোনো জায়গা নেই।’ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা চিঠিটি শেষ করেন ‘আপনার স্নেহের রাব্বানী’ লিখে।

এদিকে এ অবস্থার মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নেত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা চেষ্টা করছেন আমাদের নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিতে। আশা করি নেত্রীর সঙ্গে দেখা করে সব বিষয় খুলে বলতে পারলে তিনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply