গল্প: রাগ-অভিমান ফের অদ্ভুত প্রীতি  – CoxsbazarNEWS.Com

[ad_1]

মাহদী হাসান রিয়াদ

গত তিনদিন খুব অসুস্থ ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ,  আজ একটু ভাল্লাগছে। তেমন কাশিও নেই। জ্বরটাও মনে হচ্ছে পগারপার।  হিশামের মা-কে বললাম—অফিস যাবো, মেলা কাজ জমে আছে। বস কী বলছেন আল্লাহ ভালো জানেন। গত মাসেও চারদিন ছুটি কাটিয়েছি। তন্মধ্যে আবার এ মাসে আরো তিনদিন। তা-ও মাসের শুরুতে। না জানি, বস মনে মনে কত্ত বকা দিচ্ছে আমাকে।

-উফ্, আজ না গেলে হয় না? রাতেও আপনার গায়ে প্রচণ্ড জ্বর ছিলো। অফিসে গিয়ে জ্বর ওঠলে কী করবেন শুনি? থাক, আজকে আর যাওয়া লাগবে না, বিশ্রাম নিন৷ কাল যায়েন৷

-হিশামের মা-, তুমি বুঝবা না রে। এতো সুন্দর বউরে একা ফেলে কোথাও যেতে আমারও ইচ্ছে করে না। কিন্তু অফিসে যে কতকাজ আমার জন্য অপেক্ষা করছে, তা- কল্পনাও করতে পারবা না। যেতেই হবে৷

-হয়, আমিতো কিচ্ছু বুঝি না,সব আপনিই বুঝেন। হাজারবার বললেও তো আর আমার কথা শুনবেন না৷ কে শুনে কার কথা! আচ্ছা যান তাইলে,রেডি হোন৷ খাবার দিচ্ছি আমি৷

-ও হিশামের মা-, পারলে ঝাল করে একটা ডিম ভেজে দিয়ো তো লক্ষ্মী।

-হুম, দিমুনে। এত্তো সুন্দর করে বলতে হবে না।

‌-তিনদিন পর মুখে অন্ন দিলাম। হিশামের মায়ের ডিম ভাজা এককথায় মাশাআল্লাহ। ডাল-ডিম দিয়ে চেটেপুটে খেলাম। আলহামদুলিল্লাহ, এখন একদম ভরপেট।

-এইযে, কোথায় যাচ্ছেন এভাবে? আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখুনতো, চুল গুলো কিরকম লাগছে? আপনার’চে আমার হিশাম অনেক গোছালো। এখনো চার-পাঁচ বছরের বাচ্চাদের মতো রয়ে গেলেন। নেন, মাথায় তৈল দেন। আমি চিরুনিটা নিয়ে আসি। হয়ছে, এবার আয়নার সামনে দাঁড়ান, দেখুনতো নিজেরে আগের চেয়ে সুন্দর লাগছে কিনা?

-হ, সুন্দর তো একটু লাগছেই।

-শুনেন, আরো কথা আছে৷ আজকে বাসে করে যাবেন না৷ সিএনজি করে যাবেন। প্রয়োজনে রিজার্ভ নিবেন। আপনার মতিগতি বেশ ভালো টিকছে না, বাসে গেলে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারেন। এমনিতে শরীরের অবস্থা তেমন ভালো না।

-জ্বি জাহাঁপনা, আপনার হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো।

-যান তাহলে।আল্লাহ হাফেজ।

ওর কথামতো সিএনজিতে ওঠলাম। যেখানে বারো টাকা বাস ভাড়া  দিয়ে দিব্যি গন্তব্যে পৌঁছে যেতাম, আজ কিনা দুইশো টাকা দিয়ে যেতে হলো। ইশ,গায়ে লাগলো। তবুও  আরামে পৌঁছুলাম। গায়ে লাগলে লাগুক, মন্দ কী।

ডেক্সে বসলাম। পাশে থাকা টেলিফোন নামক যন্ত্রটি ক্রিংক্রিং করে বেজে ওঠলো। হাত বাড়িয়ে রিসিভ করলাম। ওমা, বসের কক্ষে জরুরি তলব। হাসান সাহেব, এখনই আমার কক্ষে আসেন৷ কী আর করার, যেতে তো হবেই। ভয়ে ভয়ে গেলাম। না জানি,  আজ যে কতো বকা শুনতে হবে!  মালিক, রক্ষা করুন।

-আসতে পারি স্যার?

-জ্বি, আসুন।

-হাসান সাহেব, এভাবে তো চাকরি করা যায় না। চাকরি করতে হলে কাণ্ডজ্ঞান থাকতে হয়। সবসময় মনে রাখতে হবে যে এখানে আপনি ব্যক্তিগত ব্যবসা করতে আসেন না। অন্য একজনের চাকরি করতে আসেন। এবং তার অধীনে আছেন৷  আপনার যখন ইচ্ছে তখন আসবেন এটা তো হতে পারে না। কথা গুলো মাথায় রাখবেন। সামনে থেকে যেনো এমনটা নাহয়।

– সবকিছুর জন্য ক্ষমাপ্রার্থী আমি। সামনে থেকে এমনটা আর হবে না স্যার।

এসময় পকেটের যন্ত্রটি দুইবার বেজে ওঠলো। দুনোবারই কেটে দিয়েছি। স্যারের কক্ষে থাকা অবস্থায় আরো একবার বেজে ওঠলো। কেটে দিলাম। বেরিয়ে কল লিস্ট চেক করলাম। তিনোটা হিশামের মায়ের কল৷ মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গেলো। কল ব্যাক করলাম।

কিরে, মাথায় আকল-বুদ্ধি  বলতে কিছু নেই? একবার যেহেতু কল কেটে দিয়েছি, তাহলে বুঝতে হবে আমি ব্যস্ত আছি। তবুও বারংবার ফোন দিয়ে বিরক্ত করার কারণ কী? যত্তসব।

-আপনি এভাবে কথা বলছেন কেনো?

-হুম, আমি এভাবেই কথা বলবো,কোনো সমস্যা?  এর চেয়ে সুন্দর কথা বলতে জানি না। ফোন রাখো।

আমি অফিসে আসলে হিশামের মা- কমজোর দুইবার হলেও ফোন দিয়ে খবরাখবর নেয়।  খুব বেশি ব্যস্ত থাকলে অফিস শেষ হবার আগে একবার হলেও অবশ্যই ফোন দিবেই দিবে। আশ্চর্য ব্যাপার আজকে একটাও কল দিলো না! আমিও সারাদিন দৌড়ঝাঁপের মধ্যে ছিলাম। তাই ফোন দিতে পারিনিই। তবে কী সকালে বকা দিয়েছি বলে হিশামের মা- রাগ করেছে? আচ্ছা, পরে দেখা যাবে। আগে অফিস শেষ হোক।

অফিস শেষ করে কল দিলাম। রিসিভ করলো না। আবারো দিলাম, সেইম অবস্থা। আরো বেশ কয়েকবার দিলাম। ফোন রিসিভ করার নামনিশানা পর্যন্ত নেই। হিশসমের মা- নির্ঘাত রাগ করেছে। এবার এসএমএস দিলাম। ‘তরিতরকারি কিছু লাগবে?’ দশমিনিট হয়ে গেলো, রিপ্লাই আসলো না। মেয়েটা প্রচণ্ড অভিমানী, বিশেষ করে আমার ক্ষেত্রে। কিছু বললেই তার চাঁদমুখখানি নিগূঢ় আবছা আলোয় ছেয়ে যায়। রাশি রাশি মেঘ জমে তার ফুটফুটে কপোলে। দেখতে তখন এতিম এতিম লাগে৷ প্রচুর মায়া হয়। জানি; বাসায় গিয়ে তার নৈরাশ্য মুখ দেখলে খুব খারাপ লাগবে। পৃথিবীর সমস্ত পুরুষের এমনটা লাগা স্বাভাবিকও বটে।

হিশামের মায়ের মন ভালো করার টেকনিকও পাকাপোক্ত ভাবে জানা আছে আমার। সে ফুচকা খেতে খুব পছন্দ করে। টক-ঝাল একটু বেশি দিতে হয়। হয়তো ফুচকার সামনে তার রাগ পানি হলেও হতে পারে৷ অবিশ্বাস্য নয়।  রানা ভাইয়ের দোকান থেকে ফুচকা নিয়ে বাসায় ফিরলাম। দরজায় এসে কড়া নাড়লাম। দরজা খুলে দিলো। প্রতিদিনের মতো আজকে কাঁধ থেকে ব্যাগ আর হাত থেকে থলেটা নামিয়ে নিলো না। মহারাণী বড্ড রেগে আছেন। এবার বুঝতে একদমই কষ্ট হচ্ছে না আমার। চোখ তুলে একবারও তাকাচ্ছে না আমার দিকে। আমি যেনো ভিনগ্রহের এলিয়েন।

ফ্রেশ হলাম। ততক্ষণে হিশামের মা- টেবিলে খাবার দিলো। আমিও না দেখার ভান করে ডিঙ্গিয়ে চলে আসলাম। রুমে এসে ফুচকা গুলো প্লেটে সাজিয়ে রাখলাম। কিছুক্ষণ পর হিশামের মা- আসলো। অন্য দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো—’ খাবার দিয়েছি, যার ইচ্ছে, সে খেয়ে নিবে। ‘

-ওমা,তাই বুঝি?  এইযে, আমিও ফুচকা এনেছি, সে ফুচকা খেলেই আমি ভাত খাবো৷ অন্যথায় না খেয়ে মরবো৷ মরেই যাবো, তবুও খাবো না। আমি মরলে কার কীইবা এসে যায়!

হিশামের মা- এবার রক্তচক্ষুর তীক্ষ্ণ চাহনিতে অবাক বিস্ময় তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। বেচারি অনেক কিছু বলতে চাচ্ছে, কিন্তু রাগে, ক্ষোভে কিছুই বলতে পারছে না। মুখ থেকে কোনো শব্দ বোমা বেরুচ্ছে না।

পরিশেষে বলেই ফেললো— একদম ফালতু কথা বলবেন না। মাথা গরম আছে এমনিতেই।

-আচ্ছা, সরি, সরি। আর বলবো না৷ পারলে একটু কাছে আসুন। আসতে চায় না সে!  তার কোমল হাত দুটি ধরে টেনেহিঁচড়ে পাশে বসালাম। বললাম তো সরি। সবকিছুর জন্য সরি। কানে ধরবো? উঠবস করবো? হিশামের মা- চুপ, বাকরুদ্ধ সে। বোবা সাজার অভিনয় করছে। ও হিশামের মা-, তোমার আঙ্গুল গুলো এতো সুন্দর কেনো রে? ফের হাতটা ধরলাম। হাতের উপরাংশে আলতো ভাবে চুমু লাগিয়ে দিলাম৷ ভালোবাসার চুমু। এবার হিশামের মা- মিটিমিটি হাসছে৷ মুচকি হাসি৷ সুন্নতি হাসি।

-আপনি একদম আমার সাথে কথা বলবেন না। পচা আপনি।

-ওমা, কেনো রে? তোমার সাথে কথা না বললে, কার সাথে কথা বলবো গো?

-এসব আমি জানি না। কথা বলবেন না বললাম। ব্যস।

-আচ্ছা, কথা বলবো না। এবার তার মুণ্ডটা টেনে এনে আমার বুকের উপর রাখলাম।

-কী? কথা কানে যায় না? বলছি তো আমার সাথে কথা না বলতে।

-কিরে বাপু, আমি কথা বললাম কোথায় আবার?

– তো এরকম করছেন কেনো?

-কথা না বলতে বারণ করছো, তাই কথা বলিনিই। কিন্তু তোমাকে না ছুঁতে তো বলো নাই।

-খুব চালাক।

-হ, খুব চালাক৷ আপনার মতো বউ থাকলে গর্দভরাও মস্ত সেয়ানা হতে বাধ্য।

-হয়ছে, গল্প শোনাতে হবে না আর। সকালে বকা দিছেম কেনো? কাঁদিয়েছেন কেনো আমায়?

-বিস্তারিত খুলে বললাম। সবকিছু শোনার পর একটু স্বাভাবিক হলো।

-টেবিলে খাবার রাখছি, যান গিয়ে খেয়ে নিন।

-দুপুরে খাইছো?

-এ্যাহ,বলবো না আমি।

-বুচ্ছি, খাওনি আরকি।

-হুম,খাইনি।

-আচ্ছা, আজকে একসাথে খাবো৷ কেউই নিজেরটা নিজে ধরে খেতে পারবে না। একে অপরকে খাইয়ে দিবে। ডিসিশন ফাইনাল। এ কথা বলার পর সে মুখ লুকিয়ে হাসছিলো৷

আগে আমি খাইয়ে দিলাম, এরপর সে। এভাবে  ফুচকা শেষ করলাম। এই নিয়মে ভাতও খেলাম। ভাগ্যিস হিশাম ঘুম ছিলো। নয়লে সে এসব দেখে নিশ্চিত হাসতো, হাসতে হাসতে হামাগুড়ি খেতো। পরদিন তার বন্ধু সিয়াম আর   রিহামকে বলতো—’ গতকাল কী হয়েছে জানিস? আব্বু-আম্মু ছোট বাচ্চাদের মতো করে একে অপরকে খাইয়ে দিয়েছিলো।’

পরিবারের দৈনন্দিন খুটিনাটি খুনসুটি গুলো এভাবে মানিয়ে নিলে মন্দ কী? দেইখেন  জীবনটা তখন কত্তো রোমান্টিক লাগে৷ হলফ করে বলছি, দম্পতি জীবন বেশ উপভোগ্য। সুখের জন্য, ভালোবাসার জন্য, আপনার প্রিয় মানুষটির জন্য মাঝেমধ্যে আমার মতো ভিজেবিড়ালের ছদ্মবেশ ধরলে ক্ষতি কী? সাময়িকের জন্য মিইয়ে যেতে এতো দ্বিধা কেনো ভাই আপনার? চব্বিশ ঘন্টা শান্তিতে থাকার জন্য দৈনিক দশমিনিট প্রিয়তমার সাথে প্রেমালাপ করুন। হাবিজাবি ছাইপাঁশ যা- পারেন, বলুন। এই দশমিনিটে নানান ভঙ্গিমায় কথা বলুন, যতো পারেন ঢং করুন তার সাথে। মাত্র দশমিনিট  হাঁসান তাকে, যেভাবেই হোক লাগাতার দশমিনিট হাঁসাতেই হবে প্রিয়তমাকে। এই দশমিনিটের বদৌলতে পুরোদিন দিব্যি শান্তিতে থাকতে পারবেন আপনি৷ তার কাছে তখন আপনার ইচ্ছে গুলো প্রাধান্য পাবে। কোলের শিশুর মতো করে আপনার যত্ন নিতে একটুও ভুল করবে না। অবহেলা করবে না৷

মানছি, মেয়েরা অভিমানী হয়। অস্বীকার করার সুযোগ নেই৷ কিন্তু, মেয়েরা যে সময়ে সাগরের চেয়ে উদার হয়, সেদিকটাও একটু মনে রাখবেন ইনশাআল্লাহ। মিষ্ট ভাষায় তাদের সাথে কথা বলুন। নিত্যদিন ভালোবাসার সংজ্ঞা শুনান। প্রসংশা করুন তার৷ যদি প্রিয়তমার হৃদয়ে বিন্দু পরিমাণ জায়গাও দখল করে নিতেন পারেন, তবে দেইখেন নারী জাতির ভালোবাসা কতোটা প্রকট হয়। পৃথিবীর সব ভালোবাসা সে আপনাকে দিবে৷ ভালোবাসার সাগরে হাবুডুবু খাইয়ে ছাড়বে। প্রয়োজনে তার কলিজাটা ভুনা করে আনবে আপনার জন্য।

সর্বোপরি সে-তো ঘরবাড়ি ছেড়ে, শৈশব জীবন আর কৈশোর জীবনের চিরচেনা মানুষ গুলোকে ছেড়ে অপরিচিত একজন মানুষের নীড়ে এসেছে, এসেছে অপরিচিত এক শহরে। প্রিয় মানুষগুলোকে ছেড়ে আসার শোক তাকে এখনো পিড়া দেয়। খুব সহজে তো ভুলা যায় না। তন্মধ্যে আপনার খারাপ আচরণ তার হৃদয়ে দিগুণ হয়ে আঘাত হানে। সে হুটহাট রাগ করার পেছনে এ কারণ গুলো অন্যতম। এইযে ভাই, রাগ করতেও মন লাগে, ভালোবাসা লাগে। যারতার সাথে রাগ-অভিমান করা যায় না৷ যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার, মায়ার, আদরের তার সাথেই অভিমান করা যায়। হয়তো আপনার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা আছে বলেই অভিমানটাও একটু বেশি করে৷ কষ্ট হলেও সয়ে নিয়েন, দেখবেন জীবনটা অনেক, অনেক  উপভোগ্য।



[ad_2]

সৌজন্যে

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply