গালওয়ান সীমান্তে চীনের মার্শাল আর্ট বাহিনী

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

ভারতের সঙ্গে প্রাণঘাতী সংঘাতের পর সীমান্ত বাহিনীতে মিক্সড মার্শাল আর্ট (এমএমএ) স্কোয়াড নিয়োগ দিয়েছে চীন। ভারতের সঙ্গে ওই সঙ্ঘাতে চীনের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটি এখনো জানা যায়নি। তবে ভারতের ২০ জন মারা গেছে বলে স্বীকার করেছে দেশটি। বিবিসি ও ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, এই সঙ্ঘাতে কোনো গোলাগুলি হয়নি। দুই দেশেরা সেনারা তর্কের এক পর্যায়ে শারীরিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, মার্শাল আর্টের এ যোদ্ধাদের আনা হয়েছে সিচুয়ান প্রদেশের বিখ্যাত এনবো ফাইট ক্লাব থেকে। এ ক্লাবের খেলোয়াড়েরা সাধারণত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলছে, নতুন যোদ্ধাদের সরাসরি ভারত সীমান্তে রাখা হবে কি না সেটি এখনো জানা যায়নি। তাদের প্রধান কাজ হবে সীমান্তে পাহারা দেয়া সেনাদের শারীরিক যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া। একই সঙ্গে যে কোনো প্রয়োজনে তারা সাহায্যও করবেন।

এনবো ক্লাবের প্রধান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘দেশের প্রয়োজন হলে আরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আমরা সাহায্য করবো। কয়েক দিন আগে সীমান্তে কী হয়েছে সে বিষয়ে আমি জানি না। জানার চেষ্টাও করিনি।’ ঐতিহ্যগতভাবে মার্শাল আর্টে চীনের পরিচিতি জগদ্বিখ্যাত। দেশটির বিভিন্ন স্কুলে পর্যন্ত এর কলাকৌশল শেখানো হয়।

চীন-ভারত সীমান্তে অবকাঠামো নির্মাণ চলছেই
গালওয়ান উপত্যকায় দু’দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী হাতাহাতি যুদ্ধে ২০ জন ভারতীয় সৈন্যের প্রাণহানির প্রায় দু’সপ্তাহ পরও কারাকোরাম পর্বতমালায় উভয় দেশের সীমান্তে চীনা ও ভারতীয় উভয় পক্ষেই নির্মাণ কাজ চলছে বলে উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে।

কলোরাডোভিত্তিক উপগ্রহের চিত্র সংস্থা ম্যাক্সারের এ সপ্তাহে প্রকাশিত চিত্রগুলি গালওয়ান নদী উপত্যকার পাশে নতুন নির্মাণ কার্যক্রম দেখায়। চীনা ও ভারতীয় কূটনীতিকরাও বলেছিলেন যে, সামরিক কমান্ডাররা সেখান থেকে অবস্থান সরিয়ে নিতে একমত হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ চিত্রগুলি দেখায় যে, ভারতীয়রা তাদের পাশে একটি প্রাচীর তৈরি করেছে এবং চীনারা দুর্বল সংজ্ঞায়িত সীমান্ত থেকে আরও দূরে চীনা সামরিক ঘাঁটিগুলোর সাথে সংযুক্ত একটি দীর্ঘ রাস্তা শেষে একটি ফাঁড়ি শিবির প্রসারিত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৬২ সালে এশিয়ান জায়ান্টরা শুষ্ক সীমান্ত অঞ্চলে তাদের পরস্পরবিরোধী দাবি নিয়ে যুদ্ধে নেমে আসার পরে সবচেয়ে খারাপ সহিংসতার পরে একটি চুক্তির ভগুরতা দেখা দেয়। চীন বলছে, ভারত গত অগস্টে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটিকে দুটি ফেডারেল ভূখন্ড জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চল এবং লাদাখে বিভক্ত করার পরে স্থিতাবস্থায় পরিবর্তন করেছিল, যার কিছু অংশের চীন বিরোধিতা করেছে। এ পদক্ষেপের পরে ভারত প্রকাশিত নতুন মানচিত্র বেইজিংয়ের সমালোচনায় আসে, কারণ তারা আকসাই চীনকে চীন পরিচালিত একটি অঞ্চল দেখায় কিন্তু লাদাখের অংশ হিসাবে ভারতের দাবি রয়েছে বলে প্রচার করে।

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পরে প্রতিষ্ঠিত ৩৩৮০ কিলোমিটার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলএসির প্রত্যন্ত গালওয়ান উপত্যকায় এ মাসে যে মারাত্মক সংঘর্ষ ঘটে, তার শুরু মে মাসের গোড়ার দিকে যখন চীনের বিশাল সেনাবাহিনী লাদাখের তিনটি স্থানে ভারত-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের গভীরে প্রবেশ করে তাঁবু গাড়ে।
মে মাসে কয়েকটি সঙ্ঘাতের পর ভারতীয় ও চীনা কমান্ডাররা উত্তেজনা হ্রাসের লক্ষ্যে চুক্তি করার জন্য ৬ জুন বৈঠক করেন। ভারতে চীনের রাষ্ট্রদ‚ত এইচ.ই. সান ওয়েডং মঙ্গলবার প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, উভয় পক্ষ গালওয়ান নদীর মুখের দু’পাশে পর্যবেক্ষণ পোস্ট তৈরি করতে সম্মত হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব বলেন, ৬ জুন বৈঠকে দু’পক্ষই এলএসি’র সম্মান ও মেনে চলা এবং স্থিতাবস্থা রদবদলের জন্য কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না বলে সম্মত হয়েছিল। তবে তারা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরিতে সম্মত হয়েছিল কিনা তা বিবেচনায় আনেনি।

১৫ জুন মধ্যরাতের দিকে গালওয়ান উপত্যকায় সৈন্যরা একে অপরকে পাথর, তাঁবুর স্ট্যান্ড এবং হাতাহাতি সংঘর্ষে জড়িয়েছিল। এটা ছিল ৪৫ বছরের মধ্যে দু’দেশের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক সহিংসতা।

ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুরুতর আহত এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় তুষারপাতের কারণে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষে কোনও হতাহতের শিকার হয়েছে কিনা তা চীন জানায়নি। ভারত ও চীন বিবাদের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করেছে এবং যে অঞ্চলে তা ঘটেছে তা নিয়ে নতুন দাবি করেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান বলেছেন যে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার চীনের অংশেই এই সঙ্ঘাত হয়েছিল এবং ভারতীয় বাহিনী অবৈধভাবে চীনা ভূখন্ডে প্রবেশ করেছিল। ঝাও বলেন, দায় (এই ঘটনার জন্য) পুরোপুরি চীনা পক্ষের নয়। তবে শ্রীবাস্তব বলছিলেন, এলএসির ভারতীয় অংশ ঘেঁষে খাড়া করা কাঠামো সরাতে গেলে চীন লড়াইয়ের উস্কানি দিয়েছিল। তিনি বলেন, ভারতীয় সৈন্যরা এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়।

তবে ম্যাক্সারের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভ উড বলেছেন, নদীর তীরের ম্যাক্সার চিত্রের একটি ধারা যেখানে সংঘর্ষের কয়েক সপ্তাহ আগে এবং তার পরের, তাতে দেখা গেছে যে, গালওয়ান উপত্যকাটি চীনা ঘাঁটি থেকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের রেখার দিকে প্রসারিত হয়েছে।

গালওয়ানে দুই ভারতীয় সেনার মৃত্যু
ভারতীয় দ্য ওয়্যার অনলাইন জানাচ্ছে, গালওয়ানে সেতু বানানোর সময় দু’জন সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন মালেগাঁওর ৩৭ বছরের নায়েক সচিন বিক্রম মোরে ও পাটিয়ালার ল্যান্স নায়েক সেলিম খান (২৪)। সচিন বৃহস্পতিবার ও সেলিম শুক্রবার মারা যান। সেলিম সেতু বানানোর সময় নৌকা উল্টে পানিতে ডুবে এবং সচিন ডুবে যাওয়া সেনাদের উদ্ধার করতে গিয়ে মাথায় পাথরের বাড়ি খেয়ে আহত ও পরে মারা যান। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সেলিম খানকে শহীদ আখ্যায়িত করে তার পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা এবং পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সূত্র : সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, ডন ও দ্য ওয়্যার।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply