ঘুরে আসুন অপরুপ সোনাদিয়ায়…

  জুনাইদুল ইসলাম, প্রতিনিধি- শাবিপ্রবিঃ

শান্ত ও নির্জন ভোরের সাগর তীর…। ছবিঃ জুনাইদুল ইসলাম

 আচ্ছা, একটু ভাবুন তো।সময়টা ভোর,আপনি তাবু থেকে বের হয়ে কোন নির্জন সমুদ্রের তীরের বালির ছড়ায় খালি পায়ে একা একা হাঁটছেন। আর চারপাশটা জুড়ে শুধু ছলাৎছলাৎ করে বিশাল পাহাড়সম  নীল ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ার শব্দ ছাড়া কিছুই নেই….।কোথাও কেউই নেই। আপনি দুহাত প্রসারিত করে সমুদ্রের দিকে চোখ রেখে চেয়ে থেকে নিজেকে খুঁজে ফিরছেন।

গহীন বালুর চরে আরও কিছুদূর হাঁটতেই দেখলেন বিশাল জায়গাজুড়ে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া। কাছে গিয়ে দেখতে ইচ্ছে হওয়ায় আপনি দৌঁড়ে ছুটে গেলেন। কিন্তু আপনার পায়ের আওয়াজ পেয়ে ওরা খুব দ্রুতই গর্তে লুকালো।  পিছনে তাকাতেই দেখা গেল ওইদিকে থাকা কাঁকড়াগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, আবার যদি ওইদিকে যেতে চান, তবে আপনার সামনের গর্তে লুকানো কাঁকড়াগুলো উঠে দাঁড়াবে, কৌতুহলী চোখ দুটো মাথায় তুলে আপনাকে দেখবে। এই লুকোচুরি খেলা চলতেই থাকবে…….!

আপনি ছুঁয়ে ফেলবেন মুগ্ধতার শেষ প্রান্তটাও।ছোট ছোট ইঞ্জিনের নৌকা আপনাকে ছোট ছোট খাল বেয়ে প্যারাবনের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাবে। নৌকা চলন্ত অবস্থায় দেখবেন হঠাৎ একঝাক ডুবন্ত পানকৌড়ি আপনার পাশ হতে ডানা ঝাপটিয়ে উড়াল দিয়ে চলে গেল।

প্যারাবনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার রাস্তা। ছবিঃ মোঃ রেজাউল হক

সারি সারি গাঙচিল, বক উড়ে বেড়াচ্ছে। কেয়া আর নিশিন্দার ঝোঁপের ভেতর দিয়ে আপনি চলছেন। বেয়েই চলছেন। খালের পানিগুলো গাঢ় নীল।

অথবা ভাবুন তো, গভীর রাত। একটা নির্জন স্থানে আপনারা বেশ কজন ভ্রমণপিপাসু তাবুর পাশে আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসে গিটারের টুংটাং আওয়াজে এ মেতে উঠছেন……..! অথবা শেষ বিকেল, আপনি কোন চিংড়ি ঘেরের টঙে বসে পা দুলাচ্ছেন, বিস্তীর্ণ সবুজের প্রান্ত আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অদ্ভূত তাই না?

হ্যা, আপনার এই ভাবনাগুলোতে প্রাণসঞ্চার করতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপে।

সোনাদিয়া বাংলাদেশের এমন একটা ট্যুরিস্ট স্পট যেখানে একসাথে সমুদ্র এবং ম্যানগ্রোভ বন দুটোরই স্বাদ নেয়া যায়। মাত্র নয় বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই  দ্বীপের ভেতরকার জীববৈচিত্র আর হাজারো প্রতিকূলতার মাঝে টিকে থাকা প্রায় দুই হাজার মানুষের জীবনযাত্রা দেখে  নিঃসন্দেহে আপনি অন্যরকম একটা অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরবেন। দ্বীপের মানুষদের প্রধান পেশা হল লবণ চাষ,  চিংড়ি চাষ, শুটকি উৎপাদন ও চিংড়ির পোনা আহরণ। অপরূপ সৌন্দর্যের আধার এ দ্বীপ কক্সবাজার শহর থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে সাগর গর্ভে অবস্থিত। তিন দিকে সমুদ্র সৈকত, সাগর লতায় ঢাকা বালিয়াড়ি, কেয়া- নিশিন্দার ঝোঁপ, প্যারাবনের ভেতর দিয়ে জালের মত ছোট ছোট খাল, বিভিন্ন প্রজাতির জলচর পাখির অভয়ারন্য এই দ্বীপটিকে সবার কাছে করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। গাঢ় নীল পানির সমুদ্র যেকোন ভ্রমণকারীকেই মুগ্ধতা এনে দেবে। 

সূয্যিমামা যখন অস্তাচলে নেমে আসে…। ছবিঃ জুনাইদল ইসলাম

আরও আছে বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণভূমি। ঝাউবনের ফাঁকে ফাঁকে বালির ঢিবিতে ঘেরা জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হওয়া মিঠা পানির কম গভীরতার পুকুর। যেখানে আপনি চাইলে সাঁতার কাটতে পারেন যদি সমুদ্রের ঢেউয়ে নেমে গোসল করতে ভয় পান।

এই দ্বীপে একটি সাইক্লোন সেন্টার, ২টি মসজিদ, ১টি সামুদ্রিক কাছিম পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র আছে।

এটি দেশের প্রধান শুটকি মাছ উৎপাদন কেন্দ্র। এখান থেকে দেশের সবচেয়ে ভাল মানের শুটকি কিনে নিয়ে আসতে পারেন চাইলে। এই দ্বীপটি বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির জন্য নির্বাচিত হয়েছে।

কক্সবাজার ট্যুর প্ল্যান করলে সাথে এই দ্বীপটি ঘুরে দেখাটা আপনার ভ্রমণকে পূর্ণতা এনে দেবে।  সোনাদিয়া ইজ এ মাস্ট ওয়াচ প্লেস! তবে দ্বীপে যানবাহনের ব্যবস্থা না থাকায় পুরো দ্বীপ হেঁটেই ঘুরতে হবে।

আসুন জেনে নিই একাধিক রুটে সোনাদিয়া ভ্রমণের এ টু জেড।

ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ। তবে বছরের যেকোন সময়ই যাওয়া যায়। তবে বর্ষাকালীন সময়ে পানি বেশি নীল থাকে না।   যেভাবে আসবেন :কক্সবাজার শহরের যেকোন স্থান থেকে আপনাকে আসতে হবে ‘৬ নম্বর ঘাটে’। এই ঘাটে অনেক স্পিডবোট এবং ট্রলার সবসময়ই থাকে। আপনারা সংখ্যায় ১০ জন বা কম হলে আসা যাওয়ার জন্য স্পিডবোট ভাড়া করতে পারেন ভাড়া নিবে ১৫০০-২০০০টাকা। যদি সংখ্যায় ২০-৩৫ জন হন তাহলে আসা যাওয়ার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে পারেন। ভাড়া নিবে ২০০০-৩০০০ টাকা।

এই রুটে গেলে স্পিডবোট/ট্রলার আপনাকে মহেশখালী চ্যানেল পার করিয়ে বঙ্গোপসাগর হয়ে সোনাদিয়ার পূর্বপাড়ায় নামিয়ে দেবে।

যদি আপনারা সংখ্যায় দু’একজন হন কিংবা ট্যুর বাজেট কম থাকে তাহলে এই রুট ফলো করতে পারেন- কক্সবাজার ৬ নম্বর ঘাট  হতে স্পিডবোটে করে মহেশখালী জেটিতে আসবেন। ভাড়া ৭৫টাকা।

এরপর জেটি থেকে হেঁটে অথবা রিকশায় আসবেন গোরকঘাটায়। বারবিকিউর জন্য অথবা খাওয়ার জন্য চাহিদা অনুযায়ী খাবার এখান থেকে কিনে নিবেন। গোরকঘাটা থেকে অটোতে করে চলে যাবেন ঘটিভাঙায়। ভাড়া ২০-৩০টাকা। তারপর ঘটিভাঙা থেকে প্যারাবনের ভেতর ছোট খাল বেয়ে  নৌকায় করে সোনাদিয়া। ভাড়া ৩০টাকা।

যদি হেঁটে যেতে চান অথবা ভাঁটা থাকে তাহলে সোনাদিয়া রোড হয়ে হেঁটে যেতে পারেন (রাস্তা খারাপ তাই গাড়ি চলেনা কিন্তু দুইটা ব্রিজ আছে এই রুটে) সময় লাগবে প্রায় ১ ঘণ্টা। সকালে যাত্রা করে ঘোরাঘুরি করে  বিকালে ফিরে আসুন যদি রাতে দ্বীপে থাকার প্ল্যান না থাকে।

ব্যক্তিগত /ভাড়ায় ছোট জাহাজ বা বোটে করে সরাসরি সোনাদিয়া :

অনেকে আছেন খুবই শৌখিন। ফ্যামিলির সবাইকে নিয়ে সমুদ্র দেখতে চান। তারা সমুদ্রপথে চিটাগং হয়ে কুতুবদিয়া দ্বীপ , মহেশখালী এবং সোনাদিয়া এমনকি সেন্ট মার্টিনও (জাহাজ চলাচলের মৌসুমে)  একসাথে ভ্রমণ করতে পারেন। হ্যা, অবশ্যই শীতকালীন সময়ে ট্যুর প্ল্যান করুন। সমুদ্র শান্ত অবস্থাতেই ভাল স্বাদ দেয় অন্য সময়ে তো ভয়ংকর।

থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা :দ্বীপে দু’একটা মুদির দোকান ছাড়া থাকা বা খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। তাই খাবার নিজেদেরকেই নিয়ে আসতে হয়। অথবা স্থানীয় কারও কাছে বলে খাবার রান্না করার ব্যবস্থা করতে পারেন। ওরা দেশি মুরগী জবাই করে খাওয়ায়, বিনিময়ে ওদের কিছু টাকা দিতে হয়।

ক্যাম্পিং ও বারবিকিউ :ক্যাম্পিং  করতে চাইলে তাবু নিয়ে যেতে হবে সাথে। দ্বীপ ভাল করে দেখে পছন্দসই ও উপযুক্ত জায়গা তাবু রাখার জন্য নির্বাচন করতে পারেন। সাধারণত সাইক্লোন সেন্টারের সোজা পিছনের দিকে অর্থাৎ মোবাইল টাওয়ারের আশেপাশেই ক্যাম্পিংএর ভাল জায়গা পাওয়া যায়। বারবিকিউ’র জন্য আপনাকে গোরকঘাটা হতে মুরগী ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে আনতে হবে। অবশ্য, সোনাদিয়ায় জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনতে পারেন। লাকড়ির প্রয়োজন হলে স্থানীয় কারও কাছ থেকে ম্যানেজ করতে পারবেন। 

নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা :সোনাদিয়ায় টেলিটক ছাড়া মোটামুটি সব অপারেটরের  থ্রিজি নেটওয়ার্ক এভাইলেবল। স্বভাবতই দ্বীপে  বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। স্থানীয়রা সোলার পাওয়ার ব্যবহার করে। আপনাকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পাওয়ারব্যাগ নিয়ে যেতে হবে।

খাবার পানি : সোনাদিয়ার টিউবওয়েলের পানি অত্যন্ত ভাল মানের এবং সুপেয়। তাই বাইর থেকে পানি নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে খালি বোতল নিয়ে যেতে পারেন কাজে দিবে। তাছাড়া খুব সস্তায় ডাবের পানি পেতে পারেন।

সাঁতার ও গোসল :সাধারণত সমুদ্র গভীর হওয়ায় অন্যান্য সি বিচের চেয়ে সোয়ানাদিয়ার ঢেউগুলো কয়েকগুন বড় হয়। তাই সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ভয় লাগলে পানিতে নামবেন না। ঘুরে এসে সাইক্লোন সেন্টারের পাশের টিউবওয়েলে গোসল করুন অথবা বিচের পাশে থাকা বালিয়াড়ি ঘেরা কোন পুকুরে গোসল করতে পারবেন। যেখানকার পানিতে নামেন না কেন, শেষে টিউবওয়েলের পানিতে একবার গা ভিজিয়ে নিবেন এবং শ্যাম্পু দিয়ে মাথা ধুয়ে নিবেন।

ভাষা : সোনাদিয়ার মানুষ মহেশখালী/কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেও আপনি চলিত বাংলায় কথা বললে আপনার সাথে ওরা চলিত বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করবে।মোটামুটি আপনার সব কথা ওরা বুঝবে। এ নিয়ে চিন্তা করার কিছুই নেই।তবে সাথে কক্সবাজার বা মহেশখালীর পরিচিত কেউ থাকলে দরদাম থেকে শুরু করে কথাবার্তায় খুব ভাল উপকার পাবেন।

নিরাপত্তাজনিত সাবধানতা : দ্বীপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক ট্যুরিস্টদের মধ্যে অনেক সময় শঙ্কা কাজ করে। বিশেষ করে রাত্রি যাপনের প্ল্যান থাকলে। যদিওবা এখন পর্যন্ত এমন কোন ঘটনার কথা শোনা যায়নি।এমতাবস্থায় দ্বীপে ক্যাম্পিং ও রাত্রিযাপন করতে চাইলে অবশ্যই দ্বীপের স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার ও স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে নেবেন। সম্ভব হলে গুগুল করে মহেশখালী থানার ওসি, এসআই এর নম্বর নিয়ে যাবেন।

সতর্কতা ও সাবধানতা :দ্বীপটি প্রায়ই নির্জন ও কোলাহল মুক্ত তাই একা বেশিদূর যাবেন না। দলবেঁধে থাকুন।ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে এই সুন্দর দ্বীপটির অবস্থাও অন্যান্য জায়গার মত করে ফেলবেন না। সমুদ্রে নামার সময় অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করুন। আপনার যত বেশিই টাকা থাকুক দরদাম করেই সবকিছু করুন।আর হ্যা, বারবিকিউর জন্য আগুন জ্বালালে রান্না শেষে কয়লা ছাই ভাল করে বালির গর্তে চাপা দিয়ে রাখুন। তীরে প্রচন্ড বাতাস, আগুন সহজে নেভানো যায়না। বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন কিছু থেকে অবশ্যই দূরে থাকুন।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply