চীন-ভারত সংঘর্ষঃ ৮ ঘণ্টার লড়াইয়ে শুধু পাথর নয়, ছিল লোহার রডে কাঁটা!

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

গুলি-বন্দুক বা অত্যাধুনিক অস্ত্র শুধু নয়। পাথর ছুঁড়ে, কাঁটাতার পেঁচানো লোহার রড দিয়ে মারধর করা হয়েছে ভারতীয় সেনা জওয়ানদের। লাদাখে ভারত চীনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংক্রান্ত এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে।

৪৫ বছর পর সীমান্তে চীনা সেনার আক্রমণ। প্রাণ গেল ২০ জওয়ানের। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে আরও ৪ জন। কিন্তু আচমকা কেন এই হামলা? কীভাবেই বা গণ্ডগোলের সূত্রপাত? মঙ্গলবার দিনভর এনিয়ে নানা মহলে জল্পনা চলছে। ভারতীয় সেনার তরফে জানানো হয়েছে, সোমবার রাতে প্ররোচনা ছাড়াই হামলা হয়েছে। পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়েছে এক অফিসারকে।

ভারতীয় সেনা সূত্রে খবর, শুধু খণ্ডযুদ্ধে নয়, প্রবল ঠাণ্ডায়ও বেশ কয়েকজন জওয়ান প্রাণ হারিয়েছেন। অসমর্থিত সূত্রের দাবি, চীনা সেনার অতর্কিত হামলা থেকে বাঁচতে অনেকেই গলওয়ান নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। প্রবল ঠাণ্ডা জলে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁদের মৃত্যু হয়।”

সোমবার গভীর রাতের ঘটনা। লাদাখের সুউচ্চ পর্বতমালায় গালওয়ান নদীর পূর্ব পার ধরে পেট্রোলিংয়ে বেরিয়েছিল ভারতীয় সেনার বিহার রেজিমেন্টের একটি পেট্রোলপার্টি। তাদের সঙ্গেই চীনের সেনার তীব্র সংঘাত হয়।
গালওয়ানে যেভাবে হাতাহাতি হয়েছে তা একেবারে অন্য ধরনের সংঘর্ষ, ইদানীং কালের হাইটেক সংঘর্ষের সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। নিয়ন্ত্রণ রেখায় পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে ভারতীয় সেনার দ্বন্দ্বে দেখে থাকি, প্রথমে স্মল আর্মস ব্যবহার করা হয়, তারপরে একেএকে আসে মেশিনগান, মর্টার, এবং অন্যান্য সব কিছু। এখানে তা হয়নি। ভারতীয় সেনা ও চীনা সৈন্যরা পরস্পরের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। আমার কাছে যতদূর তথ্য আছে, তাতে গালওয়ান উপত্যকায় ঘটা এই হাতাহাতিতে চীনা সৈন্যরা ব্যবহার করেছে লোহার রডের উপরে বসানো লোহার তৈরি ধারালো নখের মতো একটা অস্ত্র, যা ক্লোজড কমব্যাটে বহু দূর থেকে বিপক্ষকে আঘাত করতে পারে। দু’তরফেই ছোড়া হয়েছে পাথর। ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বেয়োনেটও। বেশি উচ্চতায় অক্সিজেন সমস্যার মধ্যে বেশিক্ষণ হাতাহাতি করাটাও খুব কষ্টকর, এতে প্রাণহানির সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বলছিলেন ভারতের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল উৎপল ভট্টাচার্য।

কে আগে হামলা চালিয়েছে, এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যেই চাপানউতোর রয়েছে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) গোটা ঘটনার দায় ১৬ নম্বর বিহার রেজিমেন্টের উপর চাপিয়েছে। জানা গিয়েছে, পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্ব লাদাখের বিভিন্ন অংশ থেকে সেনা সরাচ্ছিল দুই পক্ষই। চীন কোনও অজ্ঞাত কারণে গলওয়ান থেকে সেনা সরাতে চায়নি। এ নিয়ে এক ভারতীয় সেনা আধিকারিক চীনা সেনার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তাঁর নেতৃত্বেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় (LAC) ভারতীয় ভূখণ্ডে  ১৪ নম্বর পেট্রোলিং পয়েন্টে চীনের তাবু ও নজরদারি পোস্ট ভেঙে দেওয়া হয়। এর চীনা সেনা আচমকা হামলা চালায়। অভিযোগ, ভারতীয় জওয়ানদের লক্ষ্য করে বড় পাথর ছুঁড়তে থাকে। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থাতেই প্রাণ দিতে হয় বহু ভারতীয় সেনাকে।

১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পরে ১৯৬৭ সালে সিকিমে নাথুলার কাছে ফের দুই পক্ষ তীব্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তাতে দুই পক্ষের বহু সেনার মৃত্যু হয়। ১৯৭৫ সালে অরুণাচলে ফের দুই পক্ষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে অরুণাচল সীমান্তে। সেই ঘটনাতেও দুই পক্ষের বেশ কিছু সৈন্য নিহত হন। এর পর ২০১৭ সালে ডোকালমে ভারতীয় এবং চীনা সেনা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। পাথরবৃষ্টিও হয়। কিন্তু কারও মৃত্যু হয়নি। এ বছরেও সিকিম এবং লাদাখে দুই পক্ষ একাধিকবার হাতাহাতিতে জড়িয়েছে। তবে সোমবার রাতের ঘটনা নজিরবিহীন বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply