জনবান্ধব জমি অধিগ্রহণ

আর্থিক হিসেবে এবং প্রকল্পের আকারের দিক থেকে বর্তমান সরকার প্রায় একইসঙ্গে অনেকগুলো ‘মেগা উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রতি সরকারের বিশেষ মনোযোগ লক্ষ করা যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশে কক্সবাজারের মহেশখালী এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলাকে ‘পাওয়ার হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একাধিক কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প, সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প,  এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ প্রকল্প ছাড়াও এই দুটি স্থানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গ্যাস পাইপলাইন, সমুদ্রবন্দরসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে এবং আরও বেশ কিছু প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মহেশখালী থেকে প্রায় ৫ হাজার একর এবং কলাপাড়া থেকে প্রায় ৭ হাজার একরের অধিক জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনার তথ্য রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি  প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে প্রকল্প উন্নয়নের কাজ চলছে।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে জমি অধিগ্রহণ সবসময়ই একটি জটিল বিষয়। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষের আয় রোজগারের মূল উৎস জমি। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এই বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের ফলে কয়েক হাজার মানুষ নিশ্চিতভাবেই তাদের চাষাবাদের জমি হারাবে এবং অসংখ্য মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। জীবন জীবিকার বিষয়টি বাদ দিলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জমির সঙ্গে মানুষের রয়েছে আবেগের এবং আত্মমর্যাদার সম্পর্ক। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণে বিভিন্ন সুশাসনগত সমস্যা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়ভিত্তিক ক্ষতিপূরণ এবং জীবিকা পুনর্বাসনসহ ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যেমন, ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনে নিয়মবহির্ভূত টাকা আদায়, সম্পদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে দুর্নীতি, ক্ষতিপূরণ উত্তোলনে জমির মালিকদের ভোগান্তি ও হয়রানি, ক্ষতিপূরণ প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে অনিয়ম ইত্যাদি। এইসব কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি এদেশের মানুষ কখনোই সাদরে গ্রহণ করেনি। ফলে যেখানেই সরকার উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়েছে সেখানেই জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। ইতিপূর্বে ফুলবাড়ী, আড়িয়াল বিল, বাঁশখালী, মাতারবাড়ীসহ সব জায়গাতেই মানুষ জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়নের স্বার্থে মানুষের চাষাবাদের জমি অধিগ্রহণ করার যৌক্তিকতাকে যদি মেনেও নিই সেটাও হতে হবে জনবান্ধব। উন্নয়নের ‘সুফল’ পেতে কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর উন্নয়নের ‘দায়’ চাপানোটা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের যে অভিজ্ঞতা আমরা দেখছি সেটি কোনোভাবেই সুখকর নয়।

মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বৃহদাকার ও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ভুক্ত করা হয়েছে যেখানে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নির্দেশনা দেওয়ার কথা রয়েছে। বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের জন্য মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী এবং ধলঘাটা ইউনিয়ন থেকে ১ হাজার ৪১৪ একর জমি জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে অধিগ্রহণপূর্বক প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ২৭ জুলাই ২০১৪ তারিখে ৭-ধারায় নোটিস জারির মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হয় এবং জমির মালিকদের জমি থেকে বেদখল করা হয়। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ক্ষতিপূরণ আদায়ের জটিলতর প্রক্রিয়া এবং দুর্নীতির কারণে বিগত চার বছর পরেও অনেক জমির মালিক তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা তুলতে পারেনি বলে তথ্য রয়েছে।

মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ৭ ধারার নোটিস জারি করা হয়েছে খতিয়ানের মালিকের নামে। কিন্তু খতিয়ান সৃষ্টির পরে জমি অনেকবার ক্রয়-বিক্রয় হতে পারে যেগুলোর সৃজিত খতিয়ান রয়েছে। সৃজিত খতিয়ানের মালিকের নামে নোটিস করা হয়নি। ফলে একই জমির বিপরীতে খতিয়ান এবং সৃজিত খতিয়ান উভয় মালিক ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করলে পুরো ফাইলটি আইনি জটিলতায় পড়ে যায় এবং প্রকৃত জমির মালিকের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। এক্ষেত্রে খতিয়ানের মালিকদের মধ্যে জমির মালিকানা ও দখলকেন্দ্রিক বিরোধও থাকে। অনেকে শত্রুতাবশত আরবিট্রেশন মামলা দায়েরের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে আরও দীর্ঘায়িত করে। একইভাবে একই খতিয়ানের একাধিক মালিক হওয়ার ফলে খতিয়ানের সব মালিকের পক্ষ থেকে ‘না-দাবি পত্র’ নিয়ে একটি একক ফাইল প্রসেস করার যে নিয়ম সেটি জটিলতাপূর্ণ। ফলে দেখা যায় স্বল্প পরিমাণ জমির জন্য আলাদা আলাদা ফাইল প্রসেস করতে হয়েছে যা ব্যয়বহুল এবং শ্রম সাপেক্ষ। এছাড়া প্রায় ক্ষেত্রে দেখা গেছে জমির মালিকরা জমির ক্ষতিপূরণ দাবির সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় দলিলাদি প্রস্তুত করতে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।

মাতারবাড়ীর জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ করতে হয় কক্সবাজারে অবস্থিত জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয়ে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে জমির ক্ষতিপূরণ আদায়ে তাদের অসংখ্যবার কক্সবাজারে যেতে হয়েছে। দিনের পর দিন তারা কক্সবাজারে হোটেলে থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করেছেন। কিছু জমিমালিকের কক্সবাজারে বাসাভাড়া করে থাকারও তথ্য পাওয়া যায়। ফলে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে কক্সবাজারে যাতায়াত, থাকা ও খাওয়া বাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করতে হয়েছে। জমির দলিল উত্তোলন, খতিয়ান সৃষ্টি, খাজনা আদায়, ওয়ারিশ সনদ ও জন্মসনদ প্রদান, না-দাবিপত্র অনুমোদন, সার্ভেয়ার-কানুনগোর প্রতিবেদনপ্রাপ্তি, মিস কেইসের তারিখপ্রাপ্তি, চেকের অ্যাডভাইস এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার স্বাক্ষর নেওয়ার প্রত্যেকটি পর্যায়ে ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। টিআইবি’র এক গবেষণায় মাতারবাড়ীর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের  ক্ষতিপূরণের ২০% পর্যন্ত ঘুষ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। অন্যদিকে সম্পদের ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদের মূল্যের অতি মূল্যায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় আনার অভিযোগও রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় মাতারবাড়ীতে চিংড়িঘেরের ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ২৩ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাতের তথ্য রয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকতা থেকে শুরু করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা হয়েছে যা বর্তমানে বিচারাধীন। প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের মধ্যে অসন্তুষ্টি রয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন অনুসারে মাতারবাড়ীর জনগণ মৌজা মূল্যের দেড়গুণ হারে ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ক্ষতিপূরণ মূল্য স্থানীয় জমির বাজার মূল্যের থেকে কম। এর কারণ হলো মৌজা মূল্য নির্ধারণ করা হয় গত এক বছরের জমি বিক্রয় মূল্যের গড় হিসেবে। কিন্তু সরকারি নিবন্ধন ফি কম দেওয়ার জন্য জমি রেজিস্ট্রেশনের বিক্রয়মূল্য কম দেখানোর কারণে সরকারিভাবে রেকর্ডে থাকা বাজার মূল্য কমে যায়। বর্তমানে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন সংশোধন করে মৌজা মূল্যের তিনগুণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশনা রয়েছে।

ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করার পাশাপাশি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জরিপপূর্বক প্রকল্পের সব ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের (জমির মালিক এবং জমির ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল) তালিকা প্রণয়ন এবং নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণসহ বিস্তারিত জনসম্মুখে প্রচার করতে হবে। প্রত্যেকটি প্রকল্প এলাকায় জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখার একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করা যেতে পারে। পাশাপাশি জমির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে অধিগ্রহণকৃত জমির ওপর নির্ভরশীল স্বত্বাাধিকারহীন মানুষদেরও ক্ষতিপূরণের আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ জানানো এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যদি সম্ভব হয় প্রকল্পে অব্যবহৃত জমিগুলো জমির মালিকদের ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।

লেখক :

বিধু, পিএইচডি গবেষক, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, ইউনিভার্সিটি অব বন, জার্মানি

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply