টেকনাফের ত্রাস কে এই আব্দুল হাকিম ডাকাত?

সিবিএল২৪ রিপোর্ট:

২০ অক্টোবর আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি জনপদের বহুল আলোচিত শীর্ষ বার্মাইয়া ডাকাত  আব্দুল হাকিমের বাহিনী কর্তৃক বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী গ্রামের দুই স্কুল ছাত্রী অপহরণের ঘটনায় পুরা জেলাব্যাপী সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্য, পাশাপাশি চলছে সমালোচনার ঝড়।

জনমনে প্রশ্ন, রোহিঙ্গা আব্দুল হাকিম ডাকাত এত সাহস পেল কই? সে বারবার অধরা রয়ে যাচ্ছে কিভবে? তার খুঁটির জোর কোথায়? ইত্যাদি ইত্যাদি…

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গা ডাকাত আব্দুল হাকিম মিয়ানমারের মংডু বড় ছড়া এলাকার জানে আলমের ছেলে। মাত্র ১১ বছর আগে মিয়ানমার থেকে টেকনাফ উপজেলার শাহপরীরদ্বীপে চলে আসে আবদুল হাকিম ডাকাত। এর কয়েক বছর পর হাকিম ডাকাত তার ৫ ভাই বশির আহমদ, কবির আহমদ (বন্দুকযুদ্ধে নিহত), নজির আহমদ ও হামিদ হোছনকে নিয়ে আসে টেকনাফে। এর পর আব্দুল হাকিম জড়িয়ে পড়ে নৌ-ডাকাতিতে।

মাদক পাচার,অপহরণ, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ এসব যেন তার কাছে তুচ্ছ বিষয়। আর এইসবের পেছনে তার ছায়া হিসেবে কাজ করেন এলাকার কিছু নেতা। কথিত নেতারা এই ভয়ঙ্কর রোহিঙ্গা ডাকাতকে আশ্রয় পশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

টেকনাফের পাহাড়ী জনপদ

টেকনাফের পুরান পল্লান পাড়া পাহাড়। দেখে শান্ত স্নিগ্ধ মনে হলেও শান্তি নেই এই জনপদে। আছে ভয় আর আতঙ্ক। পাহাড় ঘেঁষে রয়েছে অসংখ্য গ্রাম।
গ্রামগুলোর মানুষ দিনের আলোয় চলাচল করলেও রাতে সবাই থাকেন একসঙ্গে। কারণ পাহাড়ে আছে ভয়ঙ্কর হাকিম। যিনি হাকিম ডাকাত নামে পরিচিত।
মিয়ানমারের বিদ্রোহী এই নেতা আবদুল হাকিম প্রকাশ ওরফে হাকিম ডাকাত যখন তখন নেমে আসতে পরে। কারণ রাতেই এরা তৎপর। গ্রামের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে তুলে নিয়ে যায় গ্রামবাসীদের। মুক্তিপণের টাকা না পেলে পড়ে থাকে তাদের লাশ। হাকিম ডাকাত এখন মিয়ানমার আরাকানের আলেকীন পার্টির নেতা হিসেবেও কাজ করছে। রোহিঙ্গা এই ডাকাতের কারণে নৈসর্গিক সুন্দর টেকনাফের সবুজ পাহাড়গুলো এখন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।

থানা সূত্রে জানা গেছে, হাকিম ডাকাতের বিরুদ্ধে ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে। জানা গেছে, পল্লান পাড়ার নিকটে ছোট ছোট ২২টি পাহাড় রয়েছে। অন্তত ৭টি পাহাড় হাকিম ডাকাতের নিয়ন্ত্রণাধীন। এগুলো হলো বাজনতলী পাহাড়, সাংবাদিক শহীদ হোসেনের বাগানের পাহাড়, জালিয়া পাড়া, ল্যাদা ক্যাম্পের পাহাড়, মোচনী ক্যাম্পের পাহাড় ও কেরুনতলী পাহাড়। কুতুবদিয়ার স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় তৈরি করা তার ও আরও দুই ভাইয়ের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র, ট্রেড লাইসেন্সও রয়েছে। পুরান পল্লানপাড়ার গহিন অরণ্যে তার আলিশান ৭টি বাড়ি রয়েছে কাঁটাতারের বেড়ায় সীমানা দেওয়া। মিয়ানমার থেকে আসা শ’খানেক পরিবারকে সে নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েছে। যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলছে সশস্ত্র ডাকাত হিসেবে। স্থানীয়রাও বলছেন একই কথা।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, টেকনাফের পাহাড়গুলোতে চষে বেড়ায় হাকিম ডাকাতের দল। পাহাড়ের গহিন জঙ্গলে অবস্থান করায় তার খোঁজ পাওয়া এক প্রকার কঠিন হয়ে দাঁঁড়িয়েছে। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চারপাশ থেকে অভিযান চালালেও কোনো না কোনো পথ ধরে সে পালিয়ে সক্ষম হয়।

স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, টেকনাফের পুরান পল্লানপাড়া পাহাড়ে আস্তানা গড়েছে হাকিম ডাকাত। কয়েক হাজার একর পাহাড় দখল করে সেখানে রাম রাজত্ব কায়েম করেছে। ধরে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়, অস্ত্র প্রশিক্ষণসহ এমন কোন অপরাধ নেই যা সে করেনা। হাকিম ডাকাতের রয়েছে নিজস্ব অস্ত্রধারী চৌকস ফোর্স। সৃষ্টি করেছে নিজস্ব বাহিনী, কর টেক্স আদায়কারী ও সমন্বয়ক। তার বাহিনীর কাছে জিম্মি টেকনাফের মানুষগুলো। প্রশাসনও তার সঠিক কোন তথ্য পাচ্ছেনা। পাহাড়ের এই রাজার কাছে অনেকটা ‘অসহায়’ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তার কারণে এলাকা ছাড়া হয়েছে শত শত পরিবার। ঝরেছে অনেক তাজা প্রাণ। হাকিম ডাকাতের অন্যতম সহযোগি হিসেবে রয়েছে আপন সহোদর নজির আহমদ, কবির আহমদ, বশির আহমদ। এরা সবাই মিয়ানমারের মংডু জেলাধীন দক্ষিণ বড়ছড়া এলাকার বাসিন্দা জানে আলম ওরফে আবদুল জলিলের ছেলে। এই বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়েছে পল্লানপাড়ার সুলতানের ছেলে পাগলা ইউনুছ। স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা ডাকাত বাহিনী কিছুদিন ধরে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকলেও গত ২৫ আগস্টের পর নতুন করে রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে সঙ্গে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠে।
স্থানীয়দের আরো অভিযোগ, ক্ষমতাধর কয়েকজন নেতার ছত্রছায়ায় আবদুল হাকিম ডাকাতের দল পাহাড়ে অবস্থান করে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। পুরান পল্লানপাড়া, জাহালিয়াপাড়া, বাহারছড়া, লেদা নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকার লোকজন তাদেরকে সহযোগিতা করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরে আব্দুল হাকিম ডাকাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকারী মোহাম্মদ রফিক আব্দুল হাকিম ডাকাত সম্পর্কে বলেন, আব্দুল হাকিমের বাহিনী পুরান পল্লান পাড়ার নুরুল কবিরের ছেলে আব্দুল কাদেরকে চার টুকরো করে হত্যা করেছিল। পরে তার লাশ পাহাড়ের ছড়ায় বাঁশ পুঁতে শুকাতে দেয়। এমন জঘন্যভাবে যে আব্দুল হাকিম মানুষের উপর নির্যাতন চালায় তা এক কথায় অবর্ণনীয়।

২০১৬ সালের ৪ জুলাই বাড়িতে ঢুকে সাবেক ইউপি সদস্য ও সদর ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম ওরফে সিরাজ মেম্বারকে (৬৮) গুলি করে হত্যার পর লাইম লাইটে চলে আসে ডাকাত আব্দুল হাকিম।

খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ইয়াবা ব্যবসা আর মানবপাচার একচ্ছত্র আধিপত্য মিয়ানমারের জানে আলির ছেলে ডাকাত আব্দুল হাকিমের। নাফ নদী থেকে ইয়াবা লুট, সীমান্তের ওপার থেকে রোহিঙ্গাদের অপহরণ করে এপারে নিয়ে আসা এবং মুক্তিপণ না পেলে হত্যা করা এখন এই বাহিনীর নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। পাহাড় ও সরকারী জমি দখলে এই বাহিনীর নাম রয়েছে শীর্ষে। টেকনাফের নয়াপড়া শরণার্থী শিবিরের ভেতরের শালবন আনসার ক্যাম্পের অস্ত্র লুট ও আনসার সদস্য হত্যা, মিয়ানমারের পুলিশ ক্যাম্পে হামলার সাথেও আব্দুল হামিদ জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রাথমিক তথ্য রয়েছে।
ডাকাত হাকিমের হাতে অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে আবদুল লতিফের ছেলে নুরুল কবির, সিএনজি ড্রাইভার মো. আলী, মুন্ডি সেলিম, নতুন পল্লানপাড়ার ও আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজ মেম্বার, আবদুল হাফিজ ও তোফায়েল অন্যতম। এছাড়া ওই বাহিনীটি অপহরণ করেছেন দুই শতেরও বেশি লোকজনকে। তাদের মধ্যে এখনো অনেকের হদিস মিলেনি। বাহিনীটির হাতে অপহৃতদের অনেকেই মুক্তিপণ দিয়ে ফেরত এসেছেন।

আস্তানায় আব্দুল হাকিম ডাকাত

টেকনাফ সীমান্তের ত্রাস, শীর্ষ ডাকাত ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী আব্দুল হাকিম ডাকাতের নিরাপদ আস্তানা হল হ্নীলা পশ্চিম লেদার গহীন অরণ্যে। এখন এই আস্তানা নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ একটি সিন্ডিকেট।
টেকনাফ সীমান্তের ত্রাস, শীর্ষ ডাকাত ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী আব্দুল হাকিম ডাকাতের অন্যতম নিরাপদ আস্তানা হল হ্নীলা পশ্চিম লেদার গহীন অরণ্যে। এখন এই আস্তানা নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ একটি সিন্ডিকেট।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়,সম্প্রতি টেকনাফ সদরে আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম মেম্বার হত্যাকান্ডের পর হতে রোহিঙ্গা ডাকাত আব্দুল হাকিমের দূর্গে প্রশাসনিক অভিযানের অজানা আতংক ছড়িয়ে পড়ায় পুরো উপজেলার পাহাড়ী জনপদের গহীণ অরণ্যে আস্তানা গড়ে তোলে। সম্প্রতি হ্নীলার নয়াপাড়া,মোচনী ও লেদা রোহিঙ্গা বস্তি সংলগ্ন পাহাড়ের গহীনে একটি আস্তানা গড়ে তোলেছে বলে লোকমুখে গুঞ্জন উঠে। পশ্চিম লেদার বেলা কাদিরের পুত্র নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নুর,আবুল কালাম,আব্দুস সালাম,নুরুল আলম,জুহুর আলম,বদর উদ্দিনের পুত্র মোহাম্মদ আমিন,রিয়াজ উদ্দিন,মুচনী ক্যাম্পের ই ব্লকের ছৈয়দুর রহমানের পুত্র রহিমুল্লাহ ওরফে ডাকাত রহিমুল্লাহ,ডি ব্লকের আব্দু শুক্কুরের পুত্র আনু প্রকাশ নাগু ডাকাত,সি ব্লকের নেজাম উদ্দিনের পুত্র ফারুক,ডি ব্লকের আব্দু শুক্কুরের পুত্র হাকিম,ই ব্লকের মোঃ পেঠানের পুত্র বাবুল প্রকাশ বাইল্ল্যা ডাকাত,লেদা রোহিঙ্গার নুর মোহাম্মদ প্রকাশ গুলি নুর মোহাম্মদ মিলে হাকিম ডাকাতের এ আস্তানা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে চরম কানা-ঘুষা চলছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা এলাকায় চুরি,ডাকাতি,ইয়াবা চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ,মাদক সেবন করে মাতলামী করে বেড়ায় বীর দর্পে কিন্তু প্রতিবাদের সাহস কারো নেই।

২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি RAB এর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ডাকাত আব্দুল হাকিমের সহযোগী ও টেকনাফ নয়াপাড়া আনসার ক্যাম্প থেকে অস্ত্র লুট মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি নুরুল আলম।

২০১৮ সালের ৮ মার্চ নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে দুই ডাকাত দলের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় নিহত হয় রোহিঙ্গা হাকিম ডাকাতের অন্যতম সহযোগী হোছন আলী ওরফে বাইল্যা ডাকাত (৩০)।

২০২০ সালের ৩ আগস্ট টেকনাফ উপজেলার নুরুল্লার ঘোনা নামক পাহাড়ি এলাকায় পুুলিশের সাথে বন্দুকযুুদ্ধে নিহত হয় ডাকাত সর্দার আব্দুল হাকিমের সহযোগী মো. জুনায়েদ, মো. আইয়ুব ও মেহেদী।

একই বছর ৭ আগস্ট সোমবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে টেকনাফের গহীন পাহাড়ে র‌্যাব-৭ সদস্যদের সাঁড়াশি অভিযানে শীর্ষ রোহিঙ্গা ডাকাত আবদুল হাকিমের দুই সহযোগিকে আটক করা হয়। এই অভিযানে উদ্ধার করা হয় ১৭ টি দেশীয় তৈরি অস্ত্র ও ৪৩৭ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকারের গুলি।

আব্দুল হাকিম ডাকাতের স্ত্রী ও ভাইয়ের মরদেহ

তার ঠিক একদিন পর অর্থাৎ ৮ আগস্ট বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আব্দুল হাকিমের স্ত্রী রুবি আকতার (২৫) ও তার ভাই কবির আহমদ (৪২)।
সম্প্রতি আব্দুল হাকিম ডাকাত পাহাড়ের গোপন আস্তানা থেকে তার অপকর্মে বাধাদানকারী টেকনাফের বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে ‘দেখে নেয়ার’ হুমকি দিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে নতুন করে তৈরী হয়েছে আতঙ্ক।

টেকনাফের অশান্ত পাহাড়ী জনপদে শান্তি পুন:প্রতিষ্ঠায় দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা হাকিম ডাকাতকে দ্রুত গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলার ভুক্তভোগী জনসাধারণ।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply