ঠোঁটকাটা: বিসিএস এবং একটা সম্ভাবনাময় জাতির অনিশ্চিত ভবিষ্যত!

আজ বাংলাদেশে ৩৮ তম বিসিএস এর চুড়ান্ত ফল বেরিয়েছে। এই ফল বের হওয়ার সাথে সাথেই দেশে একটি অন্যরকম উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনগণ তাদের চুড়ান্ত উত্তেজনার অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে। আবালবৃদ্ধবনিতার টাইমলাইনে বিসিএস ক্যাডার প্রাপ্ত বন্ধু/বড়ভাই/ছোটভাই এর ছবি রাজনৈতিক নেতার মতো কিলবিল করছে। আমার বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষী যারা এই বিসিএস এ সফলকাম হয়েছে তাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানিয়েছি।

তাদের পরামর্শ দিয়েছি যাতে আগামী দিনে সততার সাথে দেশ সেবা করেন। কিছু কিছু আঞ্চলিক গ্রুপ তাদের থানার বা জেলার ক্যাডার প্রাপ্ত ছেলেটিকে নিয়ে গৌরবের অতি উৎসাহী পোস্ট দিচ্ছে। একজন বিসিএস ক্যাডারের সম্ভাব্য ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থ উপার্জনের সম্ভাব্য সৎ ও অসৎ উপায়ের কথা মনে করে কিছু কিছু ব্যক্তি/গোষ্ঠী তোষামোদির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করে আহলাদে আটখানা হওয়ার অবস্থা।

যেন দেশে একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিসিএস একটা সরকারী চাকুরী লাভের পরীক্ষা মাত্র। এটার ওপর জাতির পাওয়া-না পাওয়া, অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন, দারিদ্র্যের হ্রাস-বৃদ্ধি, জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা, কথা বলার স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের উন্নয়ন নির্ভর করেনা। বরং বিসিএস ক্যাডার হওয়ার এই প্রক্রিয়ায় দেশ মেধাহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানসমূহ মেধাশুন্য হয়ে যাচ্ছে। প্রায় লাখ (৩,৮৯,৪৬৮ জন) পরীক্ষার্থী যেখানে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেখানে মাত্র ২২০৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন।

যে ছেলেটি মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছিলেন এদেশের গরীব জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে, বিসিএস পোকার পেছনে ছুটে না হলো তার একজন ভালো ডাক্তার হওয়া না হলো বিসিএস! এই দায়ভার নিবে কে?

মেডিক্যালে পড়াকালীন মুটে-মজুরের ঘাম ঝরানো পয়সার ভ্যাট- ট্যাক্স থেকে রাষ্ট্র যে অর্থ ব্যয় করেছেন তাঁকে ডাক্তার বানানোর জন্য সে ক্ষতি কে পুষিয়ে দেবে! কিংবা বুয়েটে ভর্তি হয়েছিল যে ছেলেটি দেশকে স্থাপত্য কলায় এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে, কি লাভ হবে পুলিশ বানিয়ে তাঁকে! আরে, পুলিশ এর দায়িত্ব তো একজন ইতিহাস/রাজনীতি বিজ্ঞান এর ছাত্রকেও দেওয়া যায়। ইতিহাসের ছাত্র কি আর ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্ব নিতে পারবেন? তাহলে এই দায়িত্বগুলো পালন করবে কে? ভাবার ব্যাপার আছে। অতএব, দেখা যাচ্ছে, সবাই বিসিএস নামের সোনার হরিনের পেছনে ছুটে ২২০৪ জন ছেলের ভাগ্য খুলেছে হয়তো; ৩ লাখ ৮৭ হাজার শিক্ষার্থী কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর দিকে যাত্রা করলেন।

আর যারা হয়েছেনও তাঁদেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যে জায়গায় গেলে দেশ বেশি উপকৃত হতো সেখানে না গিয়ে বিসিএসে আসলেন। তাতে করে ওই সব প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত মানবশক্তির ঘাটতি তৈরি হবে। ফলে, ওই সব প্রতিষ্ঠানসমুহে অযোগ্য -অদক্ষের বিষ বাষ্প ছেয়ে যাবে, দূর্নীতি বাড়বে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়বে। মনে রাখতে হবে, একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে মেধার সুষম বন্টন অতি গুরুত্বপূর্ণ।

বিসিএসে যারা কৃতকার্য হননি তাঁদেরও মনে রাখতে হবে, বিসিএসই একমাত্র সাফল্য নয়। একজন সৎ,বিবেক ও মূল্যবোধসসম্পন্ন পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিভিন্নভাবে দেশ সেবা করা যায়- শিক্ষক হয়ে জ্ঞান বিতরণ করে, কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে, উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাবার পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে, সমাজকর্মী হয়ে দেশের সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করে দেশ সেবা করা যায়।
৩৮ তম বিসিএসে কৃতকার্য -অকৃতকার্য সকলের প্রতি শুভকামনা ।।

ম্যাক ফকির
উন্নয়নকর্মী ও বিশ্লেষক

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply