ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও তার কর্মের ইতিহাস !!

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত ধূমপান করা যাবে না। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং তার চাকরির মেয়াদ শেষ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরির মেয়াদ বাড়ালেন না। প্রধানমন্ত্রী ফোন করলেন ডাঃ জাফরুল্লাহকে, ওখানে কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। গনস্বাস্থ্যে ড. ওয়াজেদ মিয়া দেখা করলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চান। সমস্যা হলো ধূমপান। ড. ওয়াজেদ মিয়া প্রচুর ধূমপান করতেন। একমাস সময় নিয়ে পরিপূর্ণভাবে ধূমপান ছেড়ে দিয়ে, বিজ্ঞান উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে। এই হচ্ছে ডাঃ জাফরুল্লাহ, নীতির প্রশ্নে যিনি আপোষহীন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে বর্তমানে মোট কর্মী সংখ্যা প্রায় ২,৫০০। এর মধ্যে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ নারী। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গণমানুষের প্রতিষ্ঠান। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক কথা হয়। প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন করেছিলেন।

চিকিৎসা ‘বাণিজ্য’ নয়, সত্যিকার অর্থেই ‘সেবা’ দেয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। স্বাস্থ্যবীমা চালু করেছে, সেই সূচনালগ্ন থেকে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ঢাকার হাসপাতালে সন্তান প্রসবের মোট খরচ ২ হাজার টাকা। সাভারে আরও কম। সিজারিয়ানের প্যাকেজ ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। ডাক্তার, ওষুধ, প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার নামে অন্য কোনো বাড়তি খরচ নেই। সাধারণ প্রসবকে উৎসাহিত করা হয়। জটিলতা দেখা না দিলে সিজার করা হয় না। অন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে সাধারণ প্রসব নেই বললেই চলে। সিজারিয়ানের প্যাকেজ সর্বনিম্ন ৬০ হাজার থেকে ২ বা ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত।

সকল রকম প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার খরচ ঢাকার মাঝারি মানের হাসপাতাল, ক্লিনিকের চেয়ে অর্ধেকেরও কম।

১৯৮১ সালে গড়ে তোলা হয় অত্যাধুনিক ‘গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যাল’। অন্য সব ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ওষুধের চেয়ে গণস্বাস্থ্য উৎপাদিত ওষুধের দাম প্রায় অর্ধেক। যেমন কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্যে অপরিহার্য ইনজেকশন ‘হ্যাপারিন’। বাজারে দাম ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। গণস্বাস্থ্যে উৎপাদিতটির দাম ২০০ টাকা।

সারা পৃথিবীতে কোলেস্টেরল কমানোর জন্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওষুধ ‘অ্যাট্রোভাসটাটিন’। গণস্বাস্থ্যে উৎপাদিত একটি ট্যাবলেটের দাম ৭ টাকা, অন্যদের উৎপাদিতটির দাম ১১ টাকা।

গনস্বাস্থ্যই বাংলাদেশে প্রথম প্যারাসিটামল এবং বেশ কিছু এন্টিবায়োটিক এর কাচামাল উৎপাদন শুরু করে। আপনি জানেন কি বেশিরভাগ কোম্পানির উল্লেখিত দুটি ওষুধের Raw Materials গণস্বাস্থ্য থেকে নেওয়া।

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ১০০ শয্যার একটি সর্বাধুনিক কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতেও এত বড় কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার নেই। এটাই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় এবং উন্নত যেকোনো দেশের সঙ্গে তুলনীয় কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার। খরচ অবিশ্বাস্য রকমের কম।

বাংলাদেশে সাধারণভাবে একবার কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডাক্তার-ওষুধ মিলিয়ে আরও বেশি পড়ে যায়। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫০ জন কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস করে থাকে। এর মধ্যে ১০-১২ শতাংশ দরিদ্র রোগীর ডায়ালাইসিস করা হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় ২০ শতাংশ রোগীর থেকে নেওয়া হয় ৮০০ টাকা। ১১০০ টাকা নেওয়া হয় ১৫ শতাংশ রোগীর থেকে। সর্বোচ্চ নেওয়া হয় ২৫০০ টাকা। তবে ২৫০০ টাকা দিয়ে যারা ডায়ালাইসিস করাতে পারেন, তারা গণস্বাস্থ্যে আসেন না। তারা অন্য নামকরা হাসপাতালে ৮ বা ১০ হাজার টাকা খরচ করে ডায়ালাইসিস করান। যদিও অন্য কোথাও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মতো সেবা পাওয়া যায় না। কিডনি রোগীর অন্য যেকোনো রোগের ডাক্তারি সেবা দেওয়া হয় সার্বক্ষণিক, দক্ষ নার্স তো থাকেনই। এসবের জন্যে আলাদা কোনো ফি নেওয়া হয় না।

স্বাধীন বাংলাদেশের ওষুধের বাজার ছিল বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। অনেক অপ্রয়োজনীয় ওষুধসহ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ওষুধ ছিল বাজারে। কিছু তারা উৎপাদন করতেন, অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে আনতেন।

দেশীয় ওষুধ শিল্প ও নীতির বিষয়টি বুঝিয়েছিলেন জিয়াউর রহমানকেও। জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ তার মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে ওষুধ নীতি নিয়ে কাজ করুক। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধী শফিউল আযমদের সঙ্গে নেওয়ায়, চার পৃষ্ঠার চিঠি লিখে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান ডা. জাফরুল্লাহ। পরবর্তীতে এরশাদকে বুঝিয়ে ওষুধ নীতি করাতে সক্ষম হন ১৯৮২ সালে। সাড়ে ৪ হাজার ওষুধ থেকে প্রায় ২৮০০ ওষুধ নিষিদ্ধ করা হয়।

দেশীয় ওষুধ শিল্পের যে বিকাশ, তা সেই বৈপ্লবিক ওষুধ নীতিরই সুফল। এখন ১৬-১৭ কোটি মানুষের চাহিদার ৯৫ শতাংশেরও বেশি ওষুধ বাংলাদেশ উৎপাদন করে। বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানিকারক দেশও। Beximco, Square, Incepta, Acme, Opsonin দেশীয় এই প্রতিষ্ঠান গুলো ডাঃ জাফরুল্লাহর ওষুধ নীতির ফলেই ব্যবসা করতে পারছে।

এখন তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একজন ট্রাস্টি। প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন দশ বছর আগে। সম্প্রতি কোনো কোনো গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে ‘ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মালিকানাধীন’ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

সঠিক তথ্যটি হলো, ডা. জাফরুল্লাহ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, মালিক নন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কোনো সম্পদের ওপর তার কোনো অধিকার নেই। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মালিক কোনো ব্যক্তি নন। মালিক বাংলাদেশের জনগণ। একজন রোগী বা অন্য দশ জন মানুষের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ওপর যে অধিকার, ডা. জাফরুল্লাহর অধিকার তার চেয়ে বেশি নয়।

তথ্যসূত্রঃ
গোলাম মোর্তোজা
উইকিপিডিয়া
The daily star

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply