থামছেই না ইয়াবা প্রবেশ: অধরা নেপথ্যের নায়করা

সাইদুল ইসলাম ফরহাদ:

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা পদক্ষেপের পরও টেকনাফে থামছেই না ইয়াবা প্রবেশ। এর উৎসভূমি মিয়ানমার থেকে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ মরণনেশা এ মাদক। এছাড়া বঙ্গোপসাগর হয়ে উপকূলীয় বিভিন্ন সীমান্ত দিয়েও আসছে ইয়াবার চালান। এসব অঞ্চলে ৩ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে মাদকবিরোধী অভিযান। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তালিকাভুক্ত এবং এর বাইরে থাকা মাদক কারবারিরা আটক হয়েছে। কিন্তু অধরা থেকে যাচ্ছে অধিকাংশ ইয়াবার নেপথ্যের নায়করা। নানা কৌশলে তারা মাদকের এ অবৈধ ব্যবসা জিইয়েই রাখছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, শুধু অভিযানেই বন্ধ হবে না মাদক প্রবেশ। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সীমান্তে নিশ্ছিদ্র প্রহরী, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত বন্ধ, মাদকের চাহিদা হ্রাস, মাদকসেবীদের পুনর্বাসনসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া একক কোনো বাহিনীকে দায়িত্ব না দিয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান পরিচালনা করলে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তারা।২০১৭ সালের মে মাসে মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণুতা) ঘোষণার পর দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু হলে বন্দুকযুদ্ধে অনেক মাদক কারবারি নিহত হয়। কিন্তু মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করে টেকনাফসহ সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের পাচার এখনও অব্যাহত ঠিকই রয়েগেছে। মেজর সিনহা হত্যার হর থেকে আবারও নতুন করে ইয়াবা সংক্রমন বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া দুই দফায় ১২৩ মাদক কারবারী আত্মসমর্পণ করলেও পুরোপুরি সুফল আসেনি।আত্মসমর্পণ কারীরা জামিনে বের হয়ে আবারো জড়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। প্রতিদিন যেসব মাদকের চালান ঢুকছে, তার ৪ ভাগের ১ ভাগ জব্দ হচ্ছে। বাকি ৩ ভাগই দেশের অভ্যন্তরে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ সচেতন মহলের।
বিজিবির হিসাব মতে,২০২১ সালে এ পর্যন্ত টেকনাফ সীমান্তে ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের জওয়ানরা বড় আকারে ইয়াবা চালান জব্দ করেছে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৬৮ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৫১ জন রোহিঙ্গা ছিল। এতে ২৬ জন সক্রিয় ডাকাত ছিল। বাকিরা মাদক কারবারি।

এর আগে ২০১৮ সালের মে থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযান ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় ৫৬ রোহিঙ্গাসহ ২০৯ জন নিহত হন। কক্সবাজার জেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ২৭৭ জন মারা গেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন সংস্থার তালিকায় কক্সবাজার জেলার ১ হাজার ১৫১ ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪ ব্যক্তিকে গডফাদার (নেপথ্যের নায়ক) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতজন ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। আত্মসমর্পণ করেছেন ২৩ জন। তারা কক্সবাজার জেলখানায় আছেন। তাদের অনেকে সেখানে বসে আত্মীয়স্বজন এবং তাদের নিয়োজিত মাদক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি ২৪ জন গডফাদার বহাল তবিয়তে আছেন। তারা একরকম ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
আরও জানা গেছে, সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর যেসব মাদক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে ছিল, তাদের অনেকে এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। পুরনো গডফাদারদের পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন গডফাদার। যাদের নাম কোনো তালিকায় নেই।

টেকনাফের যেসব পয়েন্টে ইয়াবার চালান : স্থানীয়দের মতে, টেকনাফের যেসব পয়েন্ট দিয়ে এখনও ইয়াবার চালান পাচার হয়ে আসছে সেসব পয়েন্ট হচ্ছে- শাহপরীর দ্বীপে ঘোলার চর, জালিয়াপাড়া, সাবরাংয়ের খুরের মুখ, নয়াপাড়া, আছারবনিয়া, মগপাড়া, আলুগোলার তোড়া, সিকদার পাড়া, সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, নাইট্যংপাড়া, পৌরসভার কায়ুকখালীপাড়া, কেরুনতলী, হাঙ্গার ডেইল, ট্রানজিট জেটি, হ্নীলার দমদমিয়া, দক্ষিণ জাদিমোরা ওমর খাল, জাদির তলা, ব্রিটিশপাড়া, জাইল্যাঘাট, নয়াপাড়া, মোচনী, পূর্ব লেদা, বৃহত্তর আলীখালী, রঙ্গিখালী, বাজার, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী, নয়াবাজার, মিনাবাজার-ঝিমংখালী, নয়াপাড়া, কাঞ্জরপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, ঊনছিপ্রাং, লম্বাবিল, হোয়াইক্যং পূর্বপাড়া, কোনারপাড়া, বালুখালী।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply