থেমে নেই চাঁদাবাজি, বিদেশে বসে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে এক ডজন শীর্ষ সন্ত্রাসী

সিবিএল২৪ অনলাইন রিপোর্ট:

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার পল্লীমা সংসদ নামের একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আওয়াল কামরুজ্জামান ফরিদের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন পরিচয়ে ফোন দিয়ে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। গত মঙ্গলবার ভারতের একটি নম্বর থেকে আসে এই ফোন।
এরপর নিরাপত্তা চেয়ে খিলগাঁও থানায় জিডি করেছেন ফরিদ। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলে জানিয়েছেন খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান।
চলতি বছরের মার্চ মাসে কাফরুলের হাইটেক মাল্টিকেয়ায় হাসপাতালের এক চিকিৎসকের মোবাইলে ফোন করে একইভাবে বিদেশ থেকে চাঁদা দাবি করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহিন শিকদার। চাঁদা না দিলে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। পরে ওই চিকিৎসক কাফরুল থানায় জিডি করেন। পুলিশ তাঁর অভিযোগ আমলে নিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করে। কিন্তু ক্রমাগত হুমকি দিতে থাকায় এক পর্যায়ে ওই চিকিৎসক প্রাণের ভয়ে দাবি করা চাঁদা তুলে দেন শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহিন শিকদারের লোকজনের হাতে।
এভাবেই রাজধানীতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চলছে চাঁদাবাজি। র্যাব গঠন, অভিযান ও সরকার পরিবর্তনে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ছিটকে পড়লেও থামেনি তাদের নিয়ন্ত্রণ।
সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানকে ঘিরে যুবলীগের কয়েকজন নেতার বিরোধ এবং অপরাধজগৎনিয়ে তদন্তে তথ্য উঠে এসেছে, কতিপয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সহযোগিতায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের রাজত্ব এখনো চলছে। অপরাধজগতের সন্ত্রাসীদের মধ্যে এক ডজন বিদেশে পালিয়ে থাকলেও তাদের সহযোগীরা সক্রিয়। শাহাদাত, জিসান, মোল্লা মাসুদ, শাহিন, সুব্রত বাইনসহ অনেক সন্ত্রাসীর নামে আদায় হচ্ছে চাঁদা। জিসানকে গ্রেপ্তারের পর অন্য সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘শুধু জিসানই নয়, অপরাধী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। রাজনীতিবিদ বা যে দলের নেতাই হোক, অপরাধ করলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। সে দেশেই থাকুক আর বিদেশেই থাকুক। ’ গতকাল শনিবার রাজধানীর স্বামীবাগ এলাকায় শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন ও দুস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কে কোথায় :

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য মতে, সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে জিসানসহ ১৩ সন্ত্রাসী পলাতক থাকায় তাদের নামে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি রয়েছে। অন্যদের মধ্যে একজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত, একজন গণপিটুনিতে মারা গেছে। আটজন বাংলাদেশের কারাগারে রয়েছে। জিসান দুবাইয়ে (বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার), আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর যুক্তরাষ্ট্রে, তাজগীর মালয়েশিয়ায়, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস ও বিকাশ কুমার বিশ্বাস ফ্রান্সে, আব্দুল জব্বার মুন্না, কামরুল হাসান হান্নান জার্মানিতে, শামীম আহম্মেদ ওরফে আগা শামীম কানাডায়, ভারতে আশিক, শাহাদাত, মশিউর রহমান কচি, জাফর আহমেদ ওরফে মানিক ও ইমাম হোসেন। সুব্রত বাইন ভারতের কারাগারে বন্দি। মোল্লা মাসুদও ভারতে। তানভীরুল ইসলাম জয় ভারতে গ্রেপ্তারের পর ছাড়া পেয়ে থাইল্যান্ড রয়েছেন বলে খবর আছে। হারিস যুক্তরাষ্ট্রে।
গ্রেপ্তারের পর কারাগারে আছেন সোহেল রানা চৌধুরী ওরফে ফ্রিডম সোহেল, পিচ্চি হেলাল, খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রসু, আরমান, আব্বাস ওরফে কিলার আব্বাস, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ও সানজিদুল ইসলাম ইমন। কারাগারে থাকা সুইডেন আসলাম মুক্তি পেতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

মিরপুরে শাহাদাত-সহযোগীদের ১০ গ্রুপ সক্রিয়:

পুলিশ ও র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভারতে বসে মিরপুরের অপরাধজগৎনিয়ন্ত্রণ করছেন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী শাহাদাত। শাহাদাত ছাড়াও সন্ত্রাসী শাহীন শিকদার ও বাচ্চুর নামে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও ধনাঢ্যদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। তাদের ১০টি সন্ত্রাসী গ্রুপ চাঁদা সংগ্রহ ও হুমকি দেওয়ার কাজ করে। কয়েক বছর আগে ভারত থেকে শাহাদাত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভালো পথে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু এর পরও তাঁর চাঁদাবাজির তথ্য পায় সংশ্লিষ্টরা। সূত্র জানায়, শাহাদাতের প্রধান সমন্বয়ক ডিশ বাদল গ্রেপ্তারের পর নয়ন বন্ড ভারতে হুন্ডির মাধ্যমে শাহাদাতকে চাঁদার টাকা পাঠাচ্ছেন।
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে মিরপুরের নিউ শাহাজালাল আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জুনায়েদের কাছে শাহাদাত ফোনে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। না পেয়ে ১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আনোয়ার হোসেন ওরফে কিলার সবুজকে চলতি বছর গ্রেপ্তারের পর পুরো তথ্য পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
ভারত থেকে সক্রিয় সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ
শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে মোহাম্মদ আলী ও তাঁর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আবু রাসেল মাসুদ ওরফে মোল্লা মাসুদ ভারতে অবস্থান করলেও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড তাঁদের নিয়ন্ত্রণে চলছে। সুব্রত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দমদম কারাগারে বন্দি। তবে গত জুলাইয়ের শেষ দিকে মোল্লা মাসুদ ভারতের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে আন্ডারওয়ার্ল্ডে খবর ছড়িয়েছে। সুব্রত বাইনের পক্ষে ভারত থেকে তিনি চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলেও তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে দেশে অন্তত এক ডজনের বেশি হত্যাসহ মামলার সংখ্যা ৩০-এর বেশি। ভারতে তিনি আবু রাসেল মো. মাসুদ নামে পরিচিত।

জিসান গ্রেপ্তারের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্থিরতা:

একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ইন্টারপোল জিসানকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে আন্ডারওয়ার্ল্ড অনেকটা এলোমেলো। জিসান গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঢাকায় তাঁর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হতে পারে। জিসানের সঙ্গে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাস, তাঁর ভাই মির্জা খোকন, সাদেক হোসেন খোকাসহ যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীমের যোগাযোগ ছিল। ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়ার পর খালেদ ও শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদে জিসানের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ডিবির দুই পুলিশ সদস্য হত্যাসহ বহু অপকর্মের হোতা। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। সেই সঙ্গে ঢাকায় অবস্থানকারী জিসানের ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। ’
পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান পাঁচটি হত্যাসহ ১১টি মামলার আসামি। এর মধ্যে দুই পুলিশ ছাড়াও ২০০০ সালে মতিঝিলে আরামবাগ ক্লাবে বুলু খুন, ২০০৩ সালে সানরাইজ হোটেলে দুই পুলিশ কর্মকর্তা খুন, ২০০৯ সালে মেরুল বাড্ডায় তুবা গ্রুপের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের শ্বশুর হত্যাসহ তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অনেক মামলা রয়েছে। এসব মামলার নথিপত্র দুবাই ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সুত্র: কালের কণ্ঠ

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply