নতুন কম্পিউটার ক্রয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা!

বার্তা পরিবেশকঃ

কম্পিউটারের সামগ্রী কেনার অথবা সার্ভিসিং জন্য বহু মানুষের আস্থার অপর নাম স্টার টেক। আমিও সেই বহু মানুষদের মধ্যে একজন ছিলাম। কিন্তু আমার সাথে ঘটে যাওয়া পরপর দুটো ঘটনার কারণে বিরক্ত হয়ে আমি তাদের আচরণ টা সবার সামনে একটু তুলে ধরার জন্যই পোস্টটা করা।

ঘটনা ১ঃ
কাজিনের জন্য ল্যাপটপ কিনে দিয়েছিলাম স্টার টেক থেকে। কেনার পরের দিন থেকে কাজিন আমাকে বলতেছিল বারবার, তার ল্যাপটপ স্লো চলতেছে, মানে হ্যাং করতেছে।
আমি খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি ভাবলাম যে সাময়িক সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। সমস্যা নিয়ে কাজিন আমার কাছে তিন মাস ধরে ক্যানক্যান করেছিল, ল্যাপটপের স্লো এর জন্য সে চালাতে পারছেনা, সে দশ দিনও চালাই নাই।
তো একদিন আমার বাসায় এসে দিয়ে গেল দেখার জন্য।আমিও দেখলাম যে হ্যাং করতেছে বারবার, বিভিন্ন ভাবে একটু ফাস্ট করার চেষ্টা করলাম কাজ হলো না। তাই OS সোটাপ দিয়ে দিলাম । ভাবলাম হয়তো ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু তাও দেখলাম কাজ হয় নাই। ব্রাউজার ওপেন করলেই ডিস্ক ইউজ হান্ডেট পার্সেন্ট চলে যায়। এবার আরেকটু ভালো করে ঘাটাঘাটি করে দেখলাম যে হার্ডডিক্স এর মধ্যে ব্যাড সেক্টর পড়া।
তার মানে হচ্ছে কেনার সময়ই আসলে এটা একটা ব্যাড সেক্টর পরা হার্ডডিক্স ছিল।
যেহেতু সার্ভিসিং ওয়ারেন্টি ছিল দুইবছরের তাই স্টার টেক নিয়ে গেলাম।গিয়ে সবকিছু বলে বললাম OS সেটাপ অথবা বিভিন্ন সফটওয়্যার দিয়ে ব্যাড সেক্টর রিমুভ করার বৃথা চেষ্টা বাদ দিয়ে হার্ডডিস্ক রিপ্লেস করার ব্যবস্থা করেন। ওরা বলল ওকে ঠিক আছে একমাস সময় লাগবে। তো এতদিন কেন লাগবে? Dell কোম্পানিতে জানানোর পরে ওরা পাঠাবে দেশের বাইরে থেকে, দেশে আসতে অনেক দিন সময় লাগে। আমি বললাম কি আর করার, ঠেকা যেহেতু আমার একমাস এখানে ফেলেই রাখতে হবে, তাও আমার একটা পার্মানেন্ট সলিউশন হবে সেটাই ভালো।

স্টার টেক এ দিয়ে আসার 2৫ দিন পরে কাজিন ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করল তার ল্যাপটপ ঠিক হয়েছে কিনা
তখন স্টার টেক থেকে জানানো হয়েছিল আপনার হার্ডডিক্স আমাদের কাছে চলে এসেছে লাগাতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। (একটা হার্ডডিস্ক লাগাতে কতদিন সময় লাগে ওরাই ভালো জানে)
পাঁচদিন পর ওরা নিজেরাই ফোন দিয়ে বলল আপনার ল্যাপটপ ঠিক হয়ে গিয়েছে এসে নিয়ে যান।
পরের দিন ল্যাপটপ রিসিভ করে 10 মিনিট ধরে ঘাটাঘাটি করে দেখলাম যে তেমন একটা হ্যাং করছে না। কিন্তু পুরোপুরি স্মুথলি না চলার কারণে একটু সন্দেহ বাড়াতে আরও 10 মিনিট ধরে ঘাটাঘাটি করলাম। দেখলাম যে আগের একই সমস্যায় রয়ে গিয়েছে এবং হার্ডডিস্ক চেক করে দেখলাম যে আগের ব্যাডসেক্টর পড়া হার্ডডিস্ক এখনো রয়েছে।
তারপর তাদেরকে জানানোর পরে তারা উত্তর দিয়েছিল হার্ডডিস্ক চেঞ্জ করা হয়েছে আপনাকে তো আমরা এরকম কিছু বলিনি। আমি বললাম তাহলে আপনারা এক মাস ধরে ল্যাপটপে কি সার্ভিস করেছেন।
রিসিপসনে যে ছিল সে তখন আমাকে বলল এখন রাত আটটা বেজে গিয়েছে, সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমি এখন আপনাকে কিছু জানাতে পারব না আপনি কালকে আসেন। আপনাকে ১ ঘন্টা আগে ল্যাপটপ দিয়েছি এতোক্ষণ কিছু বলেন নি কেনো। অথচ তাঁরা আমাকে ল্যাপটপ দিয়েছে ২০মিনিট হইছে। আমার মেজাজটাই খারাপ হয়েছিল এবং তাদেরকে আমি নাছোড়বান্দার মতো বললাম আমাকে কি সার্ভিস দিয়েছেন একমাস শুধু সেটা জানান ।
তখন তাদের এর উত্তর ছিল ডেল বাংলাদেশের কোন একটা থার্ড পার্টি সাপোর্ট দেয়। তাদের অফিস বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাদের সাথে কথা বলে তারপর তারা জানাবে, কালকে ফোন দেয়ার জন্য।
অনেকক্ষণ ওদের সাথে কথার পিঠে কথা চললো, বুঝলাম যে এদের সাথে কথা বলে আসলে আমার লাভ নেই, ল্যাপটপ রেখে চলে আসলাম।
পরের দিন ফোন দিয়ে খবর নেওয়ার পর বলল আপনার হার্ডডিস্কে আসলে পরিবর্তন করা হয়নি, আমরা আবার এটাকে সার্ভিসিংয়ের পাঠাচ্ছি ডেল এর কাছে, ডেল তো আসলে জানেন আপনার হার্ডডিস্ক এ কি সমস্যা হয়েছিল না হয়েছিল।
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে ওরা নিজেরাই নিজেদের পয়েন্টগুলোতে আটকে যাচ্ছিল, আগে যদি ডেলের কাছে পাঠিয়ে থাকে, তাহলে তারা কেন ফোনে বলল যে হার্ডডিক্স টা তাদের কাছে চলে এসেছে(মনে বাহিরের থেকে চলে এসেছে), লাগাতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। আবার এখন বলতেছে থার্ড-পার্টি ডেল সাপোর্ট দেয়। হার্ডডিস্ক চেঞ্জ করা হবে বলে স্টারটেক আমার কাছ থেকে এক মাস সময় চেয়ে রেখেছিল, এখন আবার বলতেছে ডেল তো জানেনা আপনার হার্ডডিস্ক এ কি সমস্যা হয়েছিল তাই তারা os সেটাপ দিয়ে দিয়েছে। এবার আসি ওএস সেটাপ এর কাহিনীতে। 26 দিন আগেই ল্যাপটপের মধ্যে OS সেটআপ করে রেখে দেয়া হয়েছিল আমাকে ল্যাপটপ দেয়ার পর আমি সেটা চেক করে দেখতে পাই। 30 দিন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর স্টারটেক অত্যন্ত সুকৌশলে ফোন দিয়ে বলেন যে আপনার ল্যাপটপ ঠিক হয়ে গিয়েছে।
আমি হলফ করে বলতে পারি এই OS স্টার টেক নিজেরাই সেটাপ দিয়েছিল তাদের সেটআপ ফাইল দেখলেই বুঝা যায়।
গ্রাহকের সাথে এত বড় প্রতারণা, জালিয়াতি এবং মিথ্যা কথা চল-চুতুরি স্টারটেক কবে থেকে শুরু করছে আমার জানা নেই। তবে এতটুকু বলতে পারি আমি না হয়ে অন্য কেউ হলে হয়তো বা সে নষ্ট হার্ডডিস্ক নিয়ে আবার বাসায় চলে আসতো।
একমাস তারা অযত্ন সহকারে ল্যাপটপটা ফেলে রেখে ধুলোবালি জমিয়ে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে।
ল্যাপটপ এখনো তাদের কাছে পড়ে আছে, জানিনা কবে ফিরে পাবো। এত হয়রানি আর সহ্য হয় না।

ঘটনা ২ঃ
4 মাস আগেএই ঘটনাটা আমার নিজের ল্যাপটপের সাথে ঘটে যাওয়া।স্টারটেক থেকেই আমি আমার ল্যাপটপের মধ্যে SSD লাগিয়েছিলাম।
আগে হার্ডডিস্ক এবং এসএসডি দুটোই একসাথে চলত আমার ল্যাপটপে। SSD এর মধ্যে শুধুমাত্র ওএস সেটাপ দেয়া ছিল। দেড় মাস পর একদিন হঠাৎ আমার ওএস ক্র্যাশ করে। আমি নতুন করে সেটআপ দিতে গেলে নিচ্ছে না। Windows can not be installed this disk সেই মেসেজটা দেখাচ্ছিলো।
হার্ডডিক্স এর ফর্মেশন চেঞ্জ হয়ে গেলে সাধারণত এই সমস্যাটা দেখায়।অনন্য করাণেও হয়। 2 দিন কমান্ড দিয়ে যত রকম ভাবে রিকভারি চেষ্টা করা যায় তার সবগুলোই আমি অ্যাপ্লাই করে ফেলেছিলাম।
উপায়ন্তর না দেখে স্টার টেকে নিয়ে গেলাম। রিসিপশনের মহিলাকে বললাম যে আমার SSD টা একটু চেক করে দেখেন এটা ঠিক আছে কিনা বা নষ্ট হয়ে গেছে কিনা। সে একটু চেক করে বলল আপনার ওএস সেটাপ দিতে হবে এসএসডি ঠিক আছে। আমি বললাম আমি সব ভাবে চেষ্টা করে ফেলেছি আমি সেটাপ দিতে গেলে সেটা হচ্ছে না। সে বলল আপনি দিতে না পারলে আমি কি করব, আপনি পেনড্রাইভ বুট করতে পারেন নাকি ঠিকমত। আমি ওনার কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করে বললাম আপনি একটু চেক করেন SSD ঠিক আছে কিনা। উনার একটাই কথা তার এখান থেকে ওএস সেটাপ দিতে হবে। আমি বারবার উনাকে বললাম আপনার এখান থেকে OS দিলে সেটা আমি সেই OS ব্যাবহার করবো না, আমার জেনুইন উইন্ডোজ আছে সিরিয়াল কী সহ, আমার iso ফাইল ছাড়া আমার সিরিয়াল কী কাজ করে না। আপনার OS যে টাকাটা দরকার হলে আমি সেটা দিয়ে দিব 300 টাকা। উল্লেখ্য, আমি কনো ক্র্যক OS এবং Software ব্যাবহার করি না সিকুরিটির জন্য।
তারপরও অনেক রিকুয়েস্ট পরে উনি আমার ল্যাপটপের মধ্যে একটা বুটেবল OS রান করে আমাকে দেখাচ্ছে যে আপনার হার্ডডিস্ক ঠিক আছে, একটু রান করেই সে খুব দ্রুত আমার ল্যাপটপ থেকে পেনড্রাইভ খুলে ফেলেছে।
আমি বললাম এই অবস্থায় বাসায় নিয়ে গিয়ে যদি সেটাপ হয় তখন তো আমাকে আবার আসতে হবে কষ্ট করে। উনার উত্তর আসতে হলে আসবেন, আপনাকে তো আমি বলেছি আমাদের থেকে সেটআপ করে নিয়ে যান।
তখন রমজান মাস চলতেছিল বারবার আসা যাওয়া খুবই কষ্টের।
বুদ্ধি করে অনেকে অনেক অনুনয় বিনয় করে বললাম আমার SSD টা একটু পার্টিশন করে দেন।
উনিও রাজি হয়ে গেলেন এবং পার্টিশন করার জন্য সার্ভিসের লোক কে দিলেন। সার্ভিসের লোক ঘন্টাখানেক অনেক চেষ্টা করেও কোন ভাবে পার্টিশন করতে পারতে ছিল না। উনিও দেখল যে আসলেই এসএসডি টা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
অথচ আমাকে দুইটা ঘন্টা ধরে যথেষ্ট হয়রানি করা হয়েছে এবং এই নষ্ট SSD নিয়ে আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল।
এবার মহিলা সুর পাল্টে গেল আপনার হার্ডডিক্সের কারণে এসএসডি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আপনারা এন্টিভাইরাস ইউজ করেন না এ কারণেই হার্ডডিস্ক নষ্ট হয়ে যায়। ২ঘন্টার মধ্যে বিভিন্ন প্রসঙ্গে উনি আমাকে অনেকবার বললেন এন্টিভাইরাস এর জন্য হার্ডডিস্ক এবং SSD দুটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম উইন্ডোজ ডিফেন্ডার তো আছেই। উইন্ডোজ ডিফেন্ডার কে উনি খুব হেয় করলেন। আমি জানিনা স্টার টেক এর কত টাকা লাভ হয় ৭০০ টাকা দিয়ে এভাবে মানুষকে উলটা বুঝিয়ে একটা অ্যান্টিভাইরাস বিক্রি করে।
তারপর বললেন আপনার এসএসডি চেঞ্জ করার জন্য পাঠানো হবে 7 দিন সময় লাগবে এবং আপনার যে হার্ডডিস্ক রয়েছে সেটা আলাদা একটা পোর্টেবল বক্সের মধ্যে ইউজ করতে হবে 500 টাকা লাগবে। ওই হার্ডডিক্স এর মধ্যে আর কোন কিছুই করা যাবে না ডাটা গুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে, ওএস সেটাপ ও দেয়া যাবে না।
500 টাকা দিয়ে আমাকে একটা পোর্টেবল হার্ডডিস্ক বক্স কিনাল। আমি নষ্ট SSD ওদেরক দিয়ে, ল্যাপটপ এবং হার্ডডিক্স নিয়ে বাসায় চলে আসলাম।
বাসায় এসে দেখলাম যে আমার হার্ডডিক্স সম্পূর্ণ ভালই রয়েছে এবং সেটাতে ওএস সেটাপ দিয়ে স্মুথলি চালানো যাচ্ছে।
500 টাকার একটা পোর্টেবল হার্ডডিস্ক বক্স এবং 300 টাকা একটা ওএস এর জন্য আমাকে এত হয়রানি কেন করা হয়েছিল তা স্টারটেক এর ম্যানেজমেন্ট ভালো বলতে পারবে।
স্টারটেক যে হার্ডডিস্ক বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিল বাসায় এসে দেখলাম যে সে হার্ডডিস্ক সম্পূর্ণ ভালই রয়েছে এবং সেটাতে ওএস সেটাপ দিয়ে স্মুথলি চালানো যাচ্ছে।

বাংলাদেশ এমন একটা দেশ এখানে কোনো ইলেকট্রিক ডিভাইস নষ্ট হলে আমি আতঙ্কের মধ্যে ভুগি। আপনার সাধারন সমস্যাকে সার্ভিসিংয়ের লোকজন অসাধারণ বানিয়ে ফেলতে পারে। ধরেন আপনার কম্পিউটারের পাওয়ার আসতেছে না, পাওয়ার সুইচ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে। সার্ভিসিংয়ের গেলে আপনাকে বলবে আপনার পুরো পাওয়ার সিস্টেম নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মাল্টীপ্ল্যানে লিফটে এক লোক বলতেছে তার ল্যাপটপ স্লো চলে তাই উনাকে এক দোকানদার অ্যান্টিভাইরাস ধরাই দিসে। এই হচ্ছে দেশের অবস্থা। যাইহোক স্টার টেক এর প্রতি একটা ভরসা ছিল তারা অন্তত এই ধরনের কাজ করে না। কিন্তু বুঝতে হবে সবার রক্ত একই ডিএনএ থেকে প্রবাহিত।
সবাই সতর্ক থাকবেন এবং কয়েক যায়গায় যাচাই-বাচাই করে ইলেন্ট্রনিক সামগ্রী সার্ভিসিং করাবেন। তার জন্যই এত কষ্ট করে এত বড় পোস্ট টি করা।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply