পর্যটন হলে বাঁচানো যাবে না দ্বীপটিকে

সোনাদিয়া দ্বীপকে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করেছিল। কারণ এখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর তা বিপদে আছে। দ্বীপটিতে বিপন্ন কচ্ছপেরা বাসা বাঁধে। অনেক পরিযায়ী পাখি আসে। শ্বাসমূলীয় বা বাদাবন আছে। এমন একটি এলাকায় সরকার একসময় গভীর সমুদ্রবন্দর করতে চেয়েছিল। এখন বলছে, অর্থনৈতিক অঞ্চল করে সেখানে ইকোট্যুরিজম বা পরিবেশসম্মত পর্যটন এলাকা গড়ে তুলবে। হোটেল-মোটেলসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করবে।

প্রকল্প করার সময় বলা হয়, এখান থেকে আমাদের অনেক অর্থনৈতিক লাভ হবে। কিন্তু এই পরিকল্পনাকারীরা কি সোনাদিয়া দ্বীপের বাদাবন আর প্রাণবৈচিত্র্যের মূল্য সম্পর্কে জানেন? এগুলো থেকে যে সুরক্ষা আমরা পাই, তার দাম কি টাকার অঙ্কে হিসাব করা হয়েছে? হলে, এই দ্বীপে এ ধরনের উদ্ভট পরিকল্পনা নেওয়া হতো না।

নব্বইয়ের দশকে সোনাদিয়া দ্বীপে সরকার বনায়ন করেছিল। প্রাকৃতিক ভাবেও বনভূমি গড়ে উঠেছিল। উচ্চ আদালত থেকেও উপকূলীয় বনভূমি রক্ষার নির্দেশ আছে। আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সিডর ও আইলার হাত থেকে রক্ষা করেছিল সুন্দরবন। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে অল্প কিছু যা বনাঞ্চল টিকে আছে, সেগুলোর একটি সোনাদিয়া। এখন পর্যটনের নামে সেটিও যদি আমরা ধ্বংস করে ফেলি, তাহলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে পূর্ব উপকূল আরও অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) আইন অনুযায়ী সংস্থাটি শুধু অনুর্বর ও ফাঁকা জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করবে। অর্থাৎ অন্য কোনো অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে নষ্ট করে কোথাও অর্থনৈতিক অঞ্চল করা যাবে না। আইনটি আরও বলছে, বেজাকে অবশ্যই পরিবেশ সংরক্ষণ আইন মেনে কাজ করতে হবে।

২০১০ সালের এ আইন এবং এর বিধিমালায় ইসিএ এলাকায় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করার জন্য কড়া সাজার বিধান আছে। এমন কাজ করলে ২ থেকে ১০ বছরের জেল এবং ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। ইসিএ এলাকা মানে, সেখানকার পরিবেশ-প্রতিবেশ অবিকৃত রাখতে হবে। সেখানে কোনো গাছপালা কাটা যাবে না। প্রাণীর আবাস ধ্বংস করা যাবে না।

সোনাদিয়া দ্বীপে অর্থনৈতিক অঞ্চলের নামে ইকোট্যুরিজম করাটা পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে বেজা দেশের প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে?

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সোনাদিয়া দ্বীপে হোটেল-মোটেল নির্মাণসহ পর্যটনের অবকাঠামো করার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছে। মন্ত্রণালয় বলছে, ইসিএ এলাকায় এগুলো করা যাবে না।

আমি নিজে এই অবস্থানকে সমর্থন করি। বেজার উচিত সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়া। এলাকাটিকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণা করা। এ দেশে ইকোট্যুরিজমের কোনো পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়নি। বেজা যদি সোনাদিয়া দ্বীপে কিছু স্থাপনা করে সেটাকে ‘ইকোট্যুরিজম’ হিসেবে দেখিয়ে আইনি অনুমোদন আদায় করে, তাহলে তো সেটা মানা যাবে না।

আমরা দেখেছি থাইল্যান্ডের মতো পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল দেশও তাদের মায়া সমুদ্রসৈকত বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ, তারা সেখানকার জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছে। এ দেশে স্পর্শকাতর যেসব এলাকাকে পর্যটনের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে কোনো রকম নিয়মনীতি-নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়নি।

কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন বা সুন্দরবন থেকে শুরু করে লাউয়াছড়া—কোথাও আমরা দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের প্রমাণ পাইনি। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এসব এলাকার জীববৈচিত্র্য তো বটেই, ন্যূনতম প্রাকৃতিক ভারসাম্য পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলেছে। সোনাদিয়া দ্বীপ এখনো নিজস্ব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে আছে। এই দ্বীপটিকে আমাদের যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। 

source: prothom alo

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply