ফুলমিয়ার দিনলিপি (পর্ব- ০৩)

পর্ব- ০৩:

ফোনে কথা বলতে বলতে মিতু হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ফুলমিয়া এটা নিশ্চিত হল ফোনের অপর প্রান্তে মিতুর প্রিয় কেউ আছে! সে এখনই জিজ্ঞেস করবে মিতু এত রাতে কার সাথে কথা বলছে? কিন্তু পরক্ষনেই চিন্তা করলো এভাবে না বরং গোপনেই ব্যাপারটা জানতে হবে। কারণ সে মিতুকে হারাতে চায় না। তাই চুপচাপ এসে শুয়ে পড়লো।
পরেরদিন স্বাভাবিকভাবেই মিতু আর ফুলমিয়া যে যার অফিসে চলে গেল। কিন্তু ফুলমিয়ার মাথায় শুধু ঘুরছে মিতু এত রাতে কার সাথে কথা বলছিল? অথচ আগে কখনো এরকম দেখে নি। মিতুর ফোন থেকে গোপনে যে নাম্বার নিবে সেই সুযোগ ও নেই। কারণ মিতু মোবাইল লক ব্যবহার করে। হঠাৎ ফুলমিয়ার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে চিন্তা করলো অফিস থেকে কয়েকদিন ছুটি নিবে। যেই ভাবা সেই কাজ, ঐদিন সে তিন দিনের ছুটি নিল। কিন্তু বাসায় এসে মিতুকে বললো অফিসের কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে তিন দিনের জন্য। রাতে ব্যাগ গুছিয়ে ফুলমিয়া বাসা থেকে বের হয়ে গেল। ফুলমিয়ার উদ্দেশ্য হল এই তিনদিন মিতুকে অনুসরণ করবে। মিতু অফিসের বাইরে কোথায় যায়?কী করে?কার সাথে মিশে এসবের উত্তর ফুলমিয়ার অবশ্যই লাগবে।
ফুলমিয়া বাসার কাছাকাছি একটা হোটেলে রুম নিল। সকাল ৯টায় যখন মিতু বাসা থেকে বের হয় তখন একটা সিএনজি নিয়ে অনুসরণ করা শুরু করলো। না,মিতু অন্য কোথাও গেল না সোজা অফিসেই ঢুকলো। ফুলমিয়া ৯টা থেকে ৪টা পর্যন্ত অফিসের আশেপাশেই থাকল। এমনকি অফিস থেকে বের হয়ে বাসা অব্দি মিতুকে অনুসরণ করলো। কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু পেল না। ফুলমিয়া ভাবলো মিতুকে সন্দেহ করা বোধয় ঠিক হচ্ছে না। কারণ একটা সংসারে বিশ্বাস হলো সবচাইতে বড় বিষয়। তাছাড়া তার মত খারাপ অতীত তো আর সবার থাকে না। মিতু হয়তো ঐ রাতে কোন পুরনো বন্ধুর সাথে কথা বলছিল। ২য় দিন ও ফুলমিয়া মিতুকে অনুসরণ করলো কিন্তু সবকিছুই স্বাভাবিক।
ফুলমিয়ার নিজের উপর বিরক্ত লাগছে। কারণ এই তিনদিনের ছুটি নেয়ার আসলে প্রয়োজন ছিল না। সবকিছুতেই তার একটু বেশী সন্দেহ। সে কী বাসায় ফিরে যাবে!আবার চিন্তা করে দেখলো আগে গেলে অফিস আর বাসা দুই দিকেই সমস্যা হতে পারে,তার চাইতে আরেকদিন কাটিয়ে যাই।শেষ দিন অর্থাৎ তৃতীয় দিনে ও ফুলমিয়া মিতুকে অনুসরণ করা শুরু করলো।বিকাল ৫টায় মিতু অফিস থেকে বের হয়ে একটা রিক্সা নিল। সাধারণত মিতু সিএনজি নিয়ে বাসায় যায়। এবার ফুলমিয়ার একটু সন্দেহ জাগলো। সেও একটা রিক্সা নিয়ে মিতুকে অনুসরণ করা শুরু করলো।

বিকাল ৫টায় মিতু অফিস থেকে বের হয়ে একটা রিক্সা নিল। সাধারণত মিতু সিএনজি নিয়ে বাসায় যায়। এবার ফুলমিয়ার একটু সন্দেহ জাগলো। সেও একটা রিক্সা নিয়ে মিতুকে অনুসরণ করা শুরু করলো। মিতু একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে থামলো তারপর রিক্সাভাড়া দিয়ে মোবাইলে কার সাথে যেন কথা বললো। ফুলমিয়া দূর থেকে সব দেখছিল।একটু পর একটা যুবক এসে মিতুকে ভিতরে নিয়ে গেল। ফুলমিয়া কী করবে বুঝতে পারছিল না। আরেকটু কাছে যেতেই দেখল ছেলেটাকে পরিচিত মনে হচ্ছে। হ্যাঁ,এ তো ইরফান। মিতুর দূর সম্পর্কের মামাত ভাই হয়। তার চাইতে বড় কথা তারা সমবয়সী ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে।
ফুলমিয়া আর সাতপাঁচ না ভেবে সোজা ইরফান আর মিতুর সামনে গিয়ে বসলো। মিতু এমনভাবে ফুলমিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে যেন ভুত দেখছে! ইরফানের ও একই অবস্হা! ফুলমিয়া পরিস্হিতি স্বাভাবিক করার জন্য নিজেই বলা শুরু করলো, আসলে কাজ শেষ হয়ে যাওয়াতে বাসায় একটু আগেভাগেই গিয়েছিলাম কিন্তু চাবিটা সাথে না থাকায় ঢুকতে পারি নি।তোমার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম কিন্তু তুমি যেহেতু আসলে না তাই রেস্টুরেন্টে খেতে আসলাম। আর এসেই তোমাদের পেয়ে গেলাম। ফুলমিয়া বলেই যাচ্ছে,কে কী খাবে বলো,আজকে আমিই হোস্ট!
এতক্ষণে মিতু বলা শুরু করলো,ইরফান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। আমি আসতে বলেছিলাম, তাই সে দেশে এসেছে। তখন ফুলমিয়া বললো খুব ভাল কথা,বাসায় নিয়ে গেলেই পারতে, এখানে কেন? মিতু বললো আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই! তারপর সবাই চুপচাপ। কিছুক্ষণ পর ইরফান ফুলমিয়াকে বললো আপনি আগে বিয়ে করেছিলেন? এই কথা শোনে ফুলমিয়ার মনে হল কেউ যেন মাথায় প্রচন্ড আঘাত করেছে। কিছুক্ষণ পর ফুলমিয়া বললো হ্যাঁ করেছিলাম তবে ওটা বিয়ে নয় দুর্ঘটনা ছিল।
হঠাৎ মিতু হো হো করে হেসে উঠলো।ফুলমিয়া খুব লজ্জা পেল কিন্তু কী বলবে বুঝতে পারছিল না। তারপরেই মিতু বলল আমার কাছেও আমাদের এটা বিয়ে নয় একটা দুর্ঘটনা মাত্র! ফুলমিয়া এই কথা শোনে থ হয়ে গেল!

চলবে….

শেখর বড়ুয়া
লেকচারার, দর্শন
কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply