বৌদ্ধদের প্রবারণা পূর্ণিমার মূল বাণী ও গুরুত্ব

পরিতোষ বড়ুয়া পবন:


ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য চিত্তের বিকাশ সাধন ও পূর্ণ্য অর্জন। প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধদের অন্যতম দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। এর অপর নাম আশ্বিনী পূর্ণিমা। ‘প্রবারণা’ শব্দের অর্থ আশার তৃপ্তি, বরণ করা, নিষেধ করা ইত্যাদি। ‘বরণ করা’ অর্থে বিশুদ্ধ বিনয়াচারে জীবন পরিচালিত করার আদর্শে ব্রতী হওয়া, আর ‘নিষেধ’ অর্থে আদর্শ ও ধর্মাচারের পরিপন্থী কর্মসমূহ পরিহার করাকে বোঝায়। তিনমাস বর্ষাবাস সমাপনান্তে ভিক্ষুসংঘ আপন আপন দোষত্রুটি অপর ভিক্ষুসংঘের নিকট প্রকাশ করে তার প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহবান জানায়। এমনকি অজ্ঞাতসারে কোনো অপরাধ হয়ে থাকলে তার জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সচেতনভাবে ঘটবে এমন কিছু দোষকে বর্জন করে গুণের প্রতি আকৃষ্ট থাকার চেতনা সৃষ্টি করাই প্রবারণার উদ্দেশ্য। শ্রাবস্তীর জেতবনে অবস্থানকালে গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘের পালনীয় হিসেবে এর প্রবর্তন করেন।
আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে প্রতিবছর প্রবারণা পালিত হয়। প্রবারণার পর ভিক্ষুসংঘকে অধীত জ্ঞান প্রচারের জন্য গ্রামে-গঞ্জে যেতে হয়। এ সময় তাঁরা কল্যাণের বাণী প্রচার করেন, যাতে দেব-মনুষ্যসহ সব প্রাণীর কল্যাণ সাধিত হয়। এভাবে প্রবারণা শেষ হওয়ার পর প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে পালিত হয় একমাসব্যাপী কঠিন চীবর দান উৎসব।
প্রবারণা পূর্ণিমার অন্য একটি উৎসবময় দিক হলো ফানুস উত্তোলন। বৌদ্ধশাস্ত্রমতে, বুদ্ধদেব আধ্যাত্মিক শক্তিবলে দেবলোকে গিয়ে মাকে ধর্মদেশনা করে এদিন স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেন। এ কারণে বৌদ্ধগণ প্রবারণা পূর্ণিমায় আকাশে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের প্রতীকরূপে ফানুস উত্তোলন করে।

এ সংক্রান্ত আরেকটি কাহিনী হলো: সিদ্ধার্থ গৌতম কোনো এক সময় মাথার এক গুচ্ছ চুল কেটে বলেছিলেন তিনি যদি সিদ্ধিলাভের উপযুক্ত হন তাহলে এই চুল যেন নিম্নে পতিত না হয়ে ঊর্ধ্বে উঠে যায়। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী চুলগুচ্ছ আকাশে উঠে গিয়েছিল। তাই বুদ্ধের কেশধাতু পূজার স্মৃতিস্বরূপ আকাশে এই ফানুস ওড়ানো হয়।তখন জ্ঞান বিজ্ঞানের ততটুকু উন্নত না হলেও রকেট স্বরুপ এই ফানুস আবিষ্কার হয়, কথিত আছে এই ফানুস থেকেই পরবর্তীতে আকাশযান তৈরি হয়। এ কারণে আত্মবিশ্লেষণের শিক্ষা, মাতৃকর্তব্য পালন ও বিনয়বিধান অনুশীলনের বহুবিধ মহিমায় এই প্রবারণা পূর্ণিমা মহিমান্বিত। প্রতিবছর আশ্বিনী পূর্ণিমায় বৌদ্ধরা শ্রদ্ধা-ভক্তি সহকারে প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করে। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় বুদ্ধপূজা,ধর্মীয় আলোচনা সভাসহ নানা পুণ্যানুষ্ঠানের। ঐদিন সকল বৌদ্ধ নর,নারী নতুন পোষাক পরে বিহারে উপস্থিত হয়,এবং সারাদিন পঞ্চশীল,অষ্টশীল গ্রহন করে, বাঙালি বৌদ্ধদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এ পূর্ণিমার আবেদন খুবই গভীর।
প্রত্যেক ধর্মেই আচার অনুষ্ঠান ও আনন্দ উৎসব থাকে। তদ্রূপ বৌদ্ধ ধর্মেও এসব রয়েছে। এসব আচার অনুষ্ঠান পারস্পরিক সু-সম্পর্ক ও অন্যান্য জাতিবর্গের সাথে সৌভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করে।
এ কারণে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। এসব ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান একদিকে যেমন পূর্ণ্য অর্জন হয় অপরদিকে ভিক্ষু, গৃহী, বৌদ্ধ ও অপরাপর সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে সু-সম্পর্কের সেতু বন্ধন তৈরি হয়।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply