‘ভুঁইফোড়’ সংগঠনে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আওয়ামী লীগ

সিবিএল২৪ ডেস্ক: আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠেছে শতাধিক নামসর্বস্ব সংগঠন। এর মধ্যে কোনো কোনো সংগঠন নিজেদের আওয়ামী লীগের অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠন দাবি করে প্রচারণায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করছে। এসব সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অভিযোগ বেশ পুরনো, যা বিতর্কিত করছে আওয়ামী লীগকে।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, তাঁতী লীগ ও যুব মহিলা লীগ দলের সহযোগী এবং ছাত্রলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনে স্থান না পাওয়া অনেক নেতাই বিভিন্ন নামে সংগঠন গড়ে তুলছেন। গঠনতন্ত্র, কার্যালয়, পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকলেও চাঁদাবাজি, তদবিরবাজি ও প্রভাব বিস্তার করতে এসব সংগঠনের নেতারা লিফলেট, ভিজিটিং কার্ড, ব্যানার-ফেস্টুন, পোস্টারে ব্যক্তি প্রচারণায় মেতে ওঠেন। পাশাপাশি দলভারী করতে সুযোগসন্ধানী ও অনুপ্রবেশকারীদের এসব সংগঠনে জায়গা দেওয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী অভিভাবক লীগ, দর্জি লীগ, চালক লীগ, প্রচার ও প্রকাশনা লীগ, তরুণ লীগ, রিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, যুব হকার্স লীগ, নৌকার মাঝি শ্রমিক লীগ, ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী লীগ, ছিন্নমূল মৎস্যজীবী লীগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লীগ, পর্যটন লীগ, নাগরিক লীগ, তরিকত লীগ, তৃণমূল লীগ, স্বাধীনতা লীগ, হোটেল শ্রমিক লীগ, হকার্স লীগ, ছিন্নমূল হকার্স লীগ, মোটরচালক লীগ, মোটর শ্রমিক লীগ, সমবায় লীগ, হারবাল লীগ, দেশীয় চিকিৎসক লীগ, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, পরিবহন শ্রমিক লীগ, বঙ্গবন্ধু হোমিওপ্যাথি লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক লীগ, বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক লীগ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় লীগ, জননেত্রী চিন্তা লীগ, মুক্তিযোদ্ধা তরুণ লীগ, মুক্তিযোদ্ধা জনতা লীগ, ডিজিটাল ছাত্রলীগ, ডিজিটাল আওয়ামী ওলামা লীগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্মচারী লীগ, নৌকার নতুন প্রজন্ম লীগ, ২১ আগস্ট ঘাতক নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন নামে সংগঠন তৈরির হিড়িক পড়েছে।

জাতীয় প্রেস ক্লাব, ডিআরইউ, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনসহ বিভিন্ন স্থানে এসব সংগঠনের মানববন্ধন, আলোচনা অনুষ্ঠানে নিয়মিতই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশ নিতে দেখা যায়। এমনকি দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে এ সংগঠনগুলো ব্যানার নিয়েই হাজির হয়। বিভিন্ন ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান, আর দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রীপুত্র জয়ের সাথে ছবি তুলে পোস্টারে, ফেসবুকে প্রচারণা চালাতেও দেখা যায় কোনো কোনো সংগঠনের নেতাদের।

উদ্ভট নাম-স্লোগান ও ছবি সংবলিত এসব ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে খোদ দলের ভেতরেই। সম্প্রতি হাসু সরকারের বাংলাদেশ আওয়ামী সজীব ওয়াজেদ জয় লীগ নামের একটি সংগঠনের ব্যানার নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। যা নিয়ে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীপুত্র নিজে মন্তব্য করে সংগঠনটির অস্তিত্ব নাকচ করেছেন। পরে এ সংগঠনের দুই নেতাকে কেরাণীগঞ্জ থেকে আটক করে পুলিশ।

এ বিষয়ে কেরাণীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক মনির হোসেন বলেন, ‘ওই নেতারা সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি ও সুযোগ সুবিধা আদায় করতেন।’ কেরাণীগঞ্জ আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শাহীন আহমেদও তাদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করেন। এ ধরনের সংগঠনের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রমাণ মেলে ২০১৪ সালে কার্যক্রম শুরু করা আরেক ভুঁইফোড় সংগঠন সজীব ওয়াজেদ জয় পরিষদের সভাপতি মাহবুব আলমের কথায়। নিজের সংগঠনকে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন দাবি করে তিনি বলেন, ‘জয় ভাইয়ের নামে অনেকেই সুবিধা নিচ্ছে, চাঁদাবাজি, সম্পদ দখল করতে পারে। তবে আমরা ভাইয়ের ও সরকারের আদর্শের জন্য কাজ করছি।’

এ সংগঠনটির চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আবুল হাসনাত জনি ২০১৬ সালে নিজেই সজীব ওয়াজেদ জয় পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দাবি করে পৃথক সংগঠন তৈরি করেন। জয়ের সাথে একটি অনুষ্ঠানের ছবি ব্যাপকভাবে প্রচার করতে দেখা যায় তাকে।

এ বিষয়ে সংগঠনটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হাছান খোকন বলেন, ‘জয় ভাই জনি ভাইকে সংগঠনটি গোছানোর দায়িত্ব দিয়েছেন।’

স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণে এসব সংগঠনের ভাঙন অবশ্য নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের চারটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফয়জুল্লাহ ও রুকনুদ্দীন পাঠান, আসাদুজ্জামান দুর্জয় ও এবাদত মুন্সি, অ্যাডভোকেট কামাল হোসেন ও জুয়েল রায়হান এবং রাজা মাহমুদ।

এ ছাড়া আওয়ামী ওলামা লীগ ইলিয়াস হোসাইন বিন হেলালী ও দেলোয়ার হোসেন এবং আক্তার হোসেন ও আবুল হাসানের নেতৃত্বে দুটি গ্রুপে বিভক্ত। উভয় গ্রুপই প্রকাশ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে জঙ্গি ও জামায়াত সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনেছেন বেশ কয়েকবার।

অন্যদিকে এসব সংগঠনের কারণে আওয়ামী লীগের মধ্যেও অন্তঃকোন্দলের ঘটনা ঘটছে। গত নভেম্বরে আওয়ামী নবীন লীগের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন, নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। এ সংগঠনটির নেতাদের খোদ প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছবি তুলে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নাসির উদ্দিন ভূঁইয়া ও আল আমিন হাওলাদারের বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া ফয়সাল আহাম্মদ মুন্সীর বাংলাদেশ আওয়ামী শিশু লীগ, ফাতেমা জামান সাথী ও আমিনুল ইসলাম স্বপনের বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, সাইফুর রহমান ছোট্ট ও আজমের বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগ, আবুল কালাম অনুর বাংলাদেশ আওয়ামী প্রজন্ম লীগের ব্যানার-পোস্টার দেখা যায়।

জানা যায়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় ও বিএনপির অবরোধ চলাকালে ব্যাপকহারে ভুঁইফোড় সংগঠন বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ আওয়ামী উদ্যাক্তা লীগের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে সংগঠনটির সমন্বয়ক জসিমউদ্দীন রুমান বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় বেশ কয়েকটি সংগঠন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমিও তরুণ উদ্যাক্তাদের নিয়ে সংগঠন তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তখন দল থেকে না করা হয়। ওই সময়ই অনলাইনে কিছু প্রচারণা ও ভিজিটিং কার্ড করেছিলাম, কিন্তু পরে আর কোনো কার্যক্রম হাতে নেয়নি।’ এসব সংগঠনের নেতাদের ‘হাইব্রিড’ নেতা বলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা নিয়মিতই সমালোচনা করলেও তাদের কার্যক্রম থেমে নেই।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ছবির পাশে টাউট, বাটপার, চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যুদের ছবি দেখলে আমি ব্যথিত হই। এ ধরনের পোস্টার দেখলে নেতাকর্মীরা তা ছিঁড়ে ফেলবেন।’

এ বিষয়ে দলের অবস্থান জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর বাইরে অন্য কোনো সংগঠনের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ গঠনতন্ত্রে নেই। তবে এসব সংগঠনের বিষয়ে বিবৃতি দিয়ে আমরা আমাদের অবস্থান আগেই জানিয়েছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনভাবে যেকোনো ব্যক্তি বা সংগঠন বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, প্রগতিশীলতা কিংবা আমাদের আদর্শ প্রচার করতে পারে। তবে এটির ভাল ও মন্দ উভয় দিকটা আছে; তা তো অস্বীকার করা যায় না। তবে আমরা আমাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোর বাইরে অন্যদের ওন (ধারণ) করি না।’উৎসঃ   পরিবর্তন

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply