মাতারবাড়িতে সরকারি বরাদ্দের টাকা নিয়ে এনজিও’র দুর্নীতি।

মাহবুব রোকন :

কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের টাকা পেতে কমিশন হিসেবে সংশ্লিষ্ট এনজিওকে দিতে হচ্ছে নির্দিষ্ট অংকের ঘুষ। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্তরা অসহায় হয়ে পড়েছে। তবে উন্নয়ন সংস্থাটির তরফে বলা হচ্ছে -এ ধরণের কমিশন নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, প্রশাসন বলছে -যারা এ কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।জানাগেছে, মহেশখালীর মাতারবাড়িতে দ্বিতীয় বিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে পরিচিতি পাওয়া -‘বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ৭০০ মেগাওয়াট ইউএসসি কোল ফার্য়াড পাওয়ার প্রজেক্ট’এ ক্ষতিগ্রস্ত জমি মালিকদের অতিরিক্ত উপহার হিসেবে সরকার প্রতি খ- জমিমালিকের সকল ওয়ারিশ(উত্তরসূরি)দেরকে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় স্থানীয়দেরকে এ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানাগেছে, মহেশখালীতে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দেশীয় মূল তদারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে -কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড -সংক্ষেপে সিপিজিসিবিএল। মূলতঃ এই সিপিজিসিবিএল এর তত্বাবধানেই ক্ষতিগ্রস্তদেরকে সরকারের এ বিশেষ বরাদ্দের টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এদিকে জমি মালিকের প্রতি উত্তরসূরিকে মাথাপিছু ২ লাখ ২০ হাজার টাকা করে দেওয়ার এ কাজটির অগ্রগতির কৌশল হিসেবে টাকা দেওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সংগ্রহ ও ফাইল প্রস্তুতির দায়িত্ব দেওয়ার জন্য তৃতীয় পক্ষ হিসেবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাছে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ‘ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অফ দি রোর‌্যাল ফুয়র -সংক্ষেপে ‘ডরপ’ নামে একটি দেশীয় এনজিও দায়িত্বটি পান।প্রায় দেড় বছর আগে এনজিওটি মাতারবাড়িতে ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সংগ্রহ ও ফাইল প্রস্তুতির কাজ শুরু করে। কাজ শুরু করার পর থেকে উন্নয়ন সংস্থাটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল -তারা প্রতিজন ক্ষতিগ্রস্তের কাছ থেকে কমিশন হিসেবে ২০ হাজার টাকা করে ঘুষ গ্রহণ করে আসছিল। এনজিওটির স্থানীয় জোনের কর্মকর্তারা এলাকার কতিপয় মাস্তান প্রকৃতির লোক সংগ্রহ করে একটি শক্তিশালী দালালচক্রও তৈরি করে। এ চক্রটির মাধ্যমেই ধারাবাহিক ভাবে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছিল লাখ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে -ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানো হয় এই বলে যে, -কমিশনের এ টাকা না দিলে ফাইলের অগ্রগতি হবে না এবং টাকা পাওয়া যাবে না। একাধিক ভুক্তভোগী জানান -টাকা না দেওয়ায় বা দাবীকৃত টাকার চাইতে কিছু টাকা কম দেওয়ায় অনেকের ফাইল দীর্ঘ সময় আটকে থেকে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে এ পর্যন্ত মানুষ টাকা দিয়েই ফাইল প্রক্রিয়া করে চলছে। বিভিন্ন সময় ভুক্তভোগীরা ঢাকায় সংস্থাটির কেন্দ্রীয় অফিসে অভিযোগ করেও কার্যকর প্রতিকার পাইনি বলে জানান অনেকেই। বেশী অভিযোগ করা হলে মাতারবাড়ির জোনাল অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বদলি করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয় -কিন্তু দুর্নীতি থামে না -অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ও কর্মকর্তাদের ভেতরে টাকার ভাগাভাগি নিয়ে গ্রুপিং সৃষ্টি হতে থাকলে বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে।ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সংগ্রহ ও ফাইল প্রস্তুতির কাজ করার কথা থাকলেও মূলতঃ ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে নগদ টাকার চেক পৌঁছানো পর্যন্ত কাজটিই করছে এনজিওটি। মাতারবাড়ির উত্তর সিকদার পাড়া এলাকার বাসিন্দা আরিফ উল্লাহ জানান -তিনি ও তার ভাই বোনের ৪টি চেক পাওয়ার বিপরীতে তাদের কাছ থেকে এনজিও সংস্থাটির মাঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জলিল মোট ৮০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে মুরাদ নামের স্থানীয় এক নেতার মধ্যস্থতায় ৭৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ৩টি চেক ছাড়ে। ৫ হাজার টাকার জন্য একটি চেক আটকিয়ে রাখলে এ নিয়ে মুরাদ ও এনজিও কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ বাকবিত-া হয়। ভুক্তভোগী আরিফ আরও জানান -কর্মকর্তা জলিল এর কথামত তিনি স্থানীয় দালাল আহমদ রেজভী প্রকাশ আহমদুর হাতে ঘুষের টাকাগুলো তুলে দেন। জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান -এ রেজভীর নেতৃত্বে রাশেদ, সায়েম, শফিক ও সাখাওয়াতসহ বেশ কয়েকজনের একটি দালাল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাতারবাড়ির এনজিও অফিসটি। স্থানীয় ইউপি সদস্য মুজিবুর রহমান জানান -দালাল ও এনজিওদের হয়রানিতে বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্তরা অতিষ্ঠ রয়েছে, এখানে ঘুষ ছাড়া কিছুই হচ্ছে না। একই কথা জানান ওই এলাকার নারী ইউপি সদস্য ছকুন তাজ বেগম। তিনি বলেন -স্থানীয় দালাল সিন্ডিকেট কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্তদেরকে ঘুষ না দিলে ক্ষতিপূরণের টাকা পাবে না বলে ভয় দেখানোর কারণে মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। এনজিওটির এমন ঘুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনে স্থানীয়দের সাথে নিয়ে আন্দোলনে যাবে বলেও জানান তিনি। মাতারবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হায়দার জানান -এলাকার জমিহারা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া টাকা নিতে এমন হয়রানি মেনে নেওয়া যায় না, যাতে লোকজন নিরাপদে টাকা নিতে পারে -সে ব্যবস্থা করার জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি দাবি জানান। প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়ার এমন ঘটনার নিন্দা জানিয়ে মাতারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ জানান -স্থানীয় প্রভাবশালী দালাল সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিবাদ করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান -ঢাকায় এনজিও ডরপ এর প্রশাসক মোহাম্মদ হায়দার আলী খানকে তিনি স্থানীয় এ অফিসের লাগামহীন ঘুষ দুর্নীতির বিষয়ে জানিয়েছেন। এসময় দুর্নীতির নায়ক এরিয়া ম্যানেজার শাহ আলমকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে বলে জানালেও অদ্যাবধি এ শাহ আলম বহালতবিয়তে রয়েছে বলে জানান এ ইউপি চেয়ারম্যান। অভিযোগের বিষয়ে জানতে মাতারবাড়ির সিকাদার পাড়া এলাকার বাসিন্দা আহমদ রেজভীর মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগ করেও তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কথা বলতে রাজি হননি। পরে এসএমএস পাঠিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। অপরদিকে মাঠ কর্মকর্তা আব্দুল জলিল জানান -তিনি ঘুষ ও কমিশন গ্রহণ করেন নি, দালালদের সাথে তার যোগাযোগ নেই। এরিয়া ম্যানেজার শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে এ কারণে তার বদলীর আদেশ এসেছে বলে জানান। শাহ আলম জানান -তিনি বদলী হয়নি, কর্মস্থলেই রয়েছেন। তিনি আর বিস্তারিত জানান নি। এমন দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকায় এনজিওটির গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক এএইচএম ফয়সাল জানান -তাদের এখানে চাকরিতে থেকে দুর্নীতি করার কোন সুযোগ নেই। অভিযুক্তদের ইতোমধ্যে বদলী করা হয়েছে, কাজে স্বচ্ছতা আনতে আরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বিষয়টি আরও খোঁজ নিচ্ছেন বলে জানান। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড এর প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান -উন্নয়ন সংস্থা ডরপ কর্তৃক ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি তিনি অবগত নন, ঘটনা সত্য হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জামিরুল ইসলাম জানান -এতোদিন দুর্নীতির বিষয়টি তাকে কেউ অবগত করেনি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply