রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ হয়ঃ সুবেদার মাহাবুব


পরিতোষ বড়ুয়া পবন :

বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতা নায়েব সুবেদার মাহাবুবুর রহমান চার দশক ধরে জার্মানিতে বসবাস করছেন ১৯৭৫ সালে ৭ই নভেম্বর তিনি সিপাহী বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ঘনটাক্রমে এই বিপ্লবের পর বন্দী হন এবং তারপর তাকে মস্কোতে দুতাবাসে চাকুরী দিয়ে পাঠানো হয় , সেখান থেকে ১৯৭৮ সালে সরকারের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট এ চলে আসেন বর্তমানে তিনি জার্মানিতেই বসবাস করছেন । সম্প্রতি এক তার একটি সাক্ষাতকার নেয়া হয় শুদ্ধস্বর ডটকমএর পক্ষ থেকে , তিনি এই সাক্ষাতকারে বলেন দেশকে একটি অরাজক পরিস্থিতি থেকে বাঁচানোর জন্য ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান করেছিলাম কিন্তু সরকার গঠনের দায়িত্ব আমাদের ছিল না , রাজনৈতিক দিকটা দেখার দায়িত্ব ছিল কর্নেল তাহেরের উপর আর তাহের জাসদের উপর নির্ভরশীল ছিল । তিনি বলেন কর্নেল তাহহেরর কোন নির্দেশ ছিল না অফিসার হত্যা করার এবং আমরা তা করিওনি, কারা হত্যা করেছে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন এটা আমাদের অজ্ঞাতেই হয়েছে , হয়তো কোন বিক্ষুদ্ধ সৈনিক অফিসারদের আচরণের প্রতিশোধ নিয়েছেন ।তিনি বলেন রাত বারোটায় আমিই প্রথম ফায়ার ওপেন করে সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা করি , তারপর সৈনিকরা সেনানিবাস ছেড়ে রাজপথে চলে আসে , রাতেই বেতার ভবন দখল করে জাসদের গণবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয় , সেই রাতেই সরকার গঠন করতে পারলে আজ দেশের রাজনইতিক ইতিহাস অন্যরকম হতো, তিনি বলেন জেনালের জিয়াকে মুক্ত করে তার হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার সিধান্ত সম্পূর্ণ কর্নেল তাহেরের , আমার মনে আছে কর্নেল তাহেরের ভাই বেলাল এবং বাহার তাহেরের এই সিধান্তের বিরোধিতা করে ছিলেন ।তিনি বলেন আমাদের দাবীর কারনেই সেই দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রাজবন্দীরা মুক্তি পায় , পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য কারাগার থেকে রব জলিল সহ নেতারা মুক্তি পান, তিনি বলেন ভারতীয় হাইকমিশন অভিযানের কথা আমরা কিছুই জানতাম না , এটা একটি হঠকারী সিধান্ত ছিল , এসব করতে যেয়ে সেনাবাহিনীতে আমাদের যতটুকু নিয়ন্ত্রণ ছিল তাও আমরা হারিয়েছি । তিনি বলেন আমাকে বন্দী করার পর আমাদের ৭জন বিপ্লবী সৈনিক নেতাকে রাজসাক্ষী করা হয় , সেই সময় ডিবি অফিসে আমার সাথে মেজর জিয়াউদ্দিনের সাথে সাক্ষাত হয় , তিনি আমাকে বলেন জেল থেকে বের হয়ে কিছু একটা করার জন্য , তাই আমরা আমি কৌশলগত কারনে রাজসাক্ষী হয়ে বের হয়ে কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম , কিন্তু আমি সহ আমাদের সহকর্মীদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয় । আমাকে মস্কো তে পাঠানো হয় বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরী দিয়ে , আমার সহকর্মীদের অস্ট্রেলিয়া, মালোশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয় কিন্তু আমরা কিছুদিন পরেই সরকারের আনুগত্য ত্যাগ করে জার্মানিতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করি । কেন সেনাবাহিনীতে সৈনিক সংস্থা গড়ে তুললেন এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান , সেই সময়ের পরিস্থিতিতে এটি করতে আমার বাধ্য হয়েছিলাম , সেনাবাহিনীর বিকল্প রক্ষীবাহিনী গঠন , সেনাবাহিনীর চেয়ে রক্ষীবাহিনীর সুযোগ সুবিধা বেশি , সেনাবাহিনীর ভেতর বৈষম্য যা একটি স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সেনাবাহিনীর জন্য অপমানজনক । ব্রিটিশ আমালের ব্যাটমান প্রথা , এবং সৈনিকদের প্রতি অফিসারদের অশোভন আচরণ , দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সব মিলিয়ে সৈনিক সংস্থা গঠনে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল বলে উল্লেখ করেন নায়েব সুবেদার মাহাবুব । তিনি বলেন কর্নেল তাহেরের ফাঁসিতে মৃত্যু আমাদের আজও ব্যথিত করে। সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসারদের চাপে জেনারেল জিয়া এই চরম সিধান্ত নিতে বাধ্যহন , ৭ই নভেম্বররের ঘটনা নিয়ে পরবর্তী সময়ে জেনারেলদের বইপত্র এবং বিভিন্ন মন্তব্য থেকে আমরা তা ধারনা করতে পারি । তিনি বলেন “হাবিলদার বারির মাধ্যমে ১৯৭৪ সালে আমার প্রথম জাসদ সভাপতি মেজর জলিলের সাতে যোগাযোগ হয় , মেজর জলিল গ্রেফতার হওয়ার পর কর্নেল তাহেরের সাথে আমার যোগাযোগ হয় , কর্নেল তাহেরের দিকনির্দেশনায় সেনাবাহিনীতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠন করে কাজ করতে থাকি । ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীতে খালেদ মোশশরফের নেতৃত্বে পাল্টা ক্যু সংগঠিত হলে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় । এই সময়ে পরিস্থিতি অনুকূলে মনে করে সিপাহী বিপ্লবের সিধান্ত নেনে কর্নেল তাহের , তার সিধান্ত অনুযায়ী আমরা বিপ্লবের ডাক দেই । বন্দী জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করি । পরবর্তীতে ঘটনাপ্রবাহে বিপ্লব ছিনতাই হয়ে যায় । সেই কাহিনী ভিন্ন , আমি আমার সৈনিকের হাতে কলম বইতে বিস্তারিত লিখেছি , আগামীতে এ বিষয়ে আরও একটি বই লেখার ইচ্ছা আছে ।”

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply