রাজাকারপুত্র মেয়র মকছুদের দাপটে ঘরছাড়া ট্রাইব্যুনালের সাক্ষী

দেশরুপান্তরঃ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের মহেশখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও একই পৌরসভার মেয়র মকছুদ মিয়ার বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনেক সাক্ষীই তার ভয়ে ঘরছাড়া। এলাকায় নির্বিঘেœ ফিরতে ও সুরক্ষার নির্দেশনা চেয়ে ভুক্তভোগীরা হাইকোর্টের দারস্থ হয়েছেন। এদের মধ্যে পূর্ণ চন্দ্রের পরিবার নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদনও করেছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে জানা যায়, মকছুদের বাবা হাশেম শিকদার (১৯৮৪ সালে মারা গেছেন) ও চাচা, ফুফারা ছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এক হয়ে মহেশখালী এলাকায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন তারা। তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ায় মকছুদ সাক্ষীদের হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন।

মকছুদ সবচেয়ে বেশি চাপে রেখেছেন মহেশখালীর দক্ষিণ হিন্দুপাড়া গোরকঘাটা এলাকার বাসিন্দা পূর্ণ চন্দ্র দের (৮৬) পরিবারকে। মহেশখালী আদিনাথ মন্দির সংস্কার কমিটির সভাপতি পূর্ণ চন্দ্র পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে ছিলেন। ছিলেন পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত মেয়র। মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরিবারের বেশ কয়েকজন শহীদ হয়েছিলেন, নির্যাতনেরও শিকার হয়েছিলেন পরিবারের একাধিক নারী। পরিবারটির ভাষ্য, এমন বেশিরভাগ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মকছুদের বাবা-চাচারা। হাশেম শিকদার ও তার ভাই জাকারিয়া শিকদার ধর্ষণ করেন পূর্ণ চন্দ্র দে’র দুই কাকাতো বোনকে। মকছুদের হুমকির মুখে দুই বোনই ইতিমধ্যে মহেশখালী ত্যাগ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে পূর্ণ চন্দ্র দে’র ভাই রবীন্দ্র লাল দে’কে হুমকির মুখে এলাকা ছাড়তে হয়েছে। পূর্ণ চন্দ্রও এখন আর এলাকায় থাকেন না।

নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে এবং এলাকায় ফিরতে সম্প্রতি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন পূর্ণ চন্দ্র দে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট একটি বেঞ্চে এর ওপর শুনানি হয়। আবেদনকারীর আইনজীবী মো. ইউনুস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারকের বাড়ি কক্সবাজার হওয়াতে তিনি বিব্রতবোধ করে জানান, তারা এই বিষয়ে শুনবেন না। এরপর আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে (আউট অব লিস্ট) বাদ দিলে আমরা অন্য একটি বেঞ্চে উপস্থাপন করি। এটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।’

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মহেশখালীর সালামত উল্লাহ খানসহ ১৬ আসামির বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। এ পর্যন্ত ১৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলায় অভিযুক্ত ১৬ আসামির মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের মতো ১৩টি অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৫ সালের ২২ মে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ৭ জনকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়। অসুস্থতাজনিত কারণে কারাগারে ৩ আসামি মারা যান। বাকিরা পলাতক। এ মামলার তদন্তকালে মকছুদ মিয়ার বাবা হাশেম শিকদারসহ পরিবারের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ পান তদন্তকারী কর্মকর্তা। মকছুদ মিয়ার চাচা জাকারিয়া শিকদার, ফুফা অলি আহমদ ও আরেক চাচা জালাল আহমদ এখনো পলাতক।

তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাশেম শিকদার, জাকারিয়া শিকদার ও অলি আহমেদের বিরুদ্ধে একাত্তরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ করার অভিযোগ পেয়েছি তদন্তে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মহেশখালীতে যত মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন এরা। এর মধ্যে হাশেম শিকদার ও জাকারিয়া শিকদারের বিরুদ্ধে পূর্ণ বাবুর বোনকে ধর্ষণের অভিযোগসহ মানবতাবিরোধী অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। একজন বীরাঙ্গনা আমাদের কাছে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তার পুরোটাই হাশেম শিকদারের নির্যাতন ও অত্যাচারের। মারা যাওয়ায় তাকে আসামি করা যায়নি।’

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তাপস কান্তি বল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৯ সাক্ষীর বয়ানে আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে আসামির সংখ্যায় এটিই সবচেয়ে বড় মামলা। আমরা চলতি বছর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করার চেষ্টা করব।’ তিনি বলেন, ‘শুনেছি সাক্ষী পূর্ণ বাবুকে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। এখন সাক্ষীরা যদি নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন তাহলে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাবেক ও বর্তমান একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন মকছুদ। টাকার জোরে তিনি জেলা ও উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের একাংশকে হাত করে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। তার দুই ভাই স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতা। ২০১৫ সালে মহেশখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হন মকছুদ। এরপর ধীরে ধীরে তার দাপটে সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার দাপট ও অনৈতিক কর্মকা- আরও বেড়েছে বলে জানান স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধের সাক্ষীদের হুমকি ও নির্যাতনই শুধু নয় মাদক ব্যবসা, ভূমি দখল, সাংবাদিক নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি আবেদন জানান পূর্ণ চন্দ্র দে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান মকছুদ মিয়া কিছু দুর্নীতিবাজ আওয়ামী লীগ নেতার আশ্রয় প্রশয়ে এলাকার পুরো হিন্দু সম্প্রদায়কে নির্যাতন ও জুলুম করছে। এমন পরিস্থিতিতে মকছুদ মিয়ার দলীয় পদবি ও দলীয় মনোনয়ন স্থগিত করার আর্জি জানান তিনি। জানতে চাইলে রবীন্দ্র লাল দে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মকছুদের বাবা ও তার চাচাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পরিবারের বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়। মামলার তদন্তের শুরু থেকেই আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ২০১৮ সালে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পর থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে এলাকায় যাই না। দাদা (পূর্ণ চন্দ্র) ও আমার ওপর হামলা হয়েছে। নিরাপত্তার ভয়ে দুজনের কেউই এখন আর এলাকায় থাকি না।’ অভিযোগ অস্বীকার করে মহেশখালী পৌরসভার মেয়র মকছুদ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবা মারা গেছেন ৩৬ বছর আগে। এখন এত বছর পর তারা কেন এগুলো বলছে আমি বুঝি না। যারা বলছে তাদের কাউকে আমি চিনি না। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কিছু লোক ইস্যু তৈরি করে এগুলো বলছেন।’

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply