সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের বলি হতে যাওয়া মহেশখালীঃ ফিরোজ আহমেদ

মিনামাতা আর মহেশখালী

২০১৩ সালে জেনেভায় এক সম্মেলনে ১৪০ দেশ ‘মিনামাতা সনদ’ নামক একটা আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছিল। বাংলাদেশও সেই ১৪০ দেশের একটি। ‘মিনামাতা সনদ কী? মিনামাতা জাপানের ছোট্ট একটি উপকূলীয় শহর। সুদূর সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনের নাম মিনামাতার নামে হওয়ার কারণটা মর্মান্তিক। মিনামাতা নগরটি জাপানের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রাসায়নিক দূষণের শিকার হয়েছিল।

মিনামাতা সনদের ঘোষিত লক্ষ্য এর প্রথম অনুচ্ছেদেই বলা আছে : ‘মানুষ ও প্রকৃতিকে পারদ ও পারদজাত যৌগসমূহের মানবসৃষ্ট উদ্গিরণ ও নিঃসরণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া’ (এর অনুচ্ছেদগুলোর জন্য দেখুন t.ly/MmxK6)। একটি রাসায়নিক পদার্থের বিষক্রিয়া কত ভয়াবহ হলে কেবল তা নিয়েই একটি আন্তর্জাতিক সনদ গৃহীত হতে পারে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাতে স্বাক্ষরও করতে পারে! (মিনামাতা ব্যাধি নিয়ে দেখুন এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি t.ly/gdRN3)। পারদের তীব্র বিষে অজস্র মানুষের মৃত্যু হয় সেখানে, পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ শিশুদের জন্ম ঘটতে থাকে। মায়ের দুধও বিষিয়ে যেতে থাকে এই বিষের প্রভাবে। মাছ থেকে শুরু করে বেড়াল পর্যন্ত মিনামাতার কোনো প্রাণী রক্ষা পায়নি এই বিষক্রিয়া থেকে।

এই মিনামাতা সনদে ভারত স্বাক্ষর করেছে। চীন-জাপান স্বাক্ষর করেছে। করেছে যুক্তরাজ্যও। মালয়েশিয়া করেছে, করেছে সিঙ্গাপুর। এই দেশগুলোর নাম কেন বললাম? কারণ অতিসম্প্রতি খুব গ্রহণযোগ্য একটি প্রতিবেদন এসেছে, ছয়টি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে কার্বনবোমায় পরিণত করছে, তারা হলো যথাক্রমে চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাজ্য মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর! বিশেষ করে জাপানের নামটি এই তালিকায় থাকাটা নিয়তির পরিহাস নয়কি? কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম ভয়াবহ দূষণ উপাদান হলো পারদ।

২. সম্প্রতি মহেশখালী যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, স্থানীয় কিছু তরুণ শিক্ষার্থীর আমন্ত্রণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিষয়ে একটি সভায় যোগ দিতে। দিনভর পুলিশ ও প্রশাসন উদ্যোক্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে, সেটার প্রতিবাদ করতে গেলে স্থানীয়দের ওপর লাঠিচার্জ, ধাওয়া ও ভীতিপ্রদর্শনসহ আরও বহুবিধ ধরনের নিপীড়নও চলে। ফলে ৬ জানুয়ারির ওই সভাটি আর অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।

স্থানীয় অজস্র মানুষের সঙ্গে কথা বলে যা যা জানতে পারলাম, তা ঘোরতর নিন্দনীয়। এত বড় প্রকল্প হতে যাচ্ছে, কিন্তু স্থানীয়রা আদৌ জানেন না আসলে কয়টা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প সেখানে হতে যাচ্ছে। পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, কক্সবাজার জেলায় ১৭টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে মহেশখালীতেই ১২টি। বিপদে আছে পুরো কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার স্পর্শকাতর পরিবেশ।

বাপার ওই গবেষণায় আরও ভীতিকর একটি তথ্য দেওয়া আছে। সেটি হলো, চীন ও জাপানে সালফার ও কার্বন নিঃসরণের যে মানদণ্ড আছে, তার তুলনায় প্রস্তাবিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সালফার ডাই-অক্সাইড ২১ গুণ, নাইট্রোজেন অক্সাইড ৮ গুণ এবং অন্যান্য কণা ১০ গুণ বেশি নিঃসরণ ঘটাবে! মহেশখালীতে মিঠাপানির একমাত্র উৎস হলো নলকূপ। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যে বিপুল পানি লাগে, তাতে পুরো মহেশখালী শুকিয়ে যাবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ফেলা গরম পানিতে মাছেরা মারা যাবে, যারা টিকে থাকবে, পারদপুষ্ট শৈবাল খেয়ে তারা হবে এক একটি জীবন্ত বিষের আধার। দৈনিকের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই বিপদের মাত্রাটা ফুটিয়ে তোলা কঠিন, আগ্রহীরা বরং এই বিষয়ক ওয়েবসাইটগুলো দেখে নিতে পারেন।

৩. মহেশখালীতে যতদূর চলা গেল, রাস্তা প্রধানত ভাঙা। ধুলো-ধূসর ভাঙা রাস্তাঘাটের একটা মলিন নগর। অথচ বাংলাদেশে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক অবদান বিশাল। বিপুল মাছ, শুঁটকি, মহেশখালীর বিখ্যাত মিঠা পান এবং অন্যান্য সবজি ও ধানের আবাদ হয় এখানে। আছে মহিষ ও অন্যান্য গবাদিপশুর বাথান। সাড়ে তিন থেকে চার লাখ মানুষের সংস্থান করছে এই দ্বীপটি।

আজ থেকে দুইশত বিশ বছর আগে ১৭৯৮ সালে ফ্রান্সিস বুখানন এই দ্বীপটি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ‘অতি মনোরম দ্বীপ’ হিসেবে। মৎস্য ও কৃষিতে এর অনন্য সম্ভাবনা তার চোখ এড়ায়নি। মহেশখালী নামটিকে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘মাছখালী’ হিসেবে। এই কয়েক লাখ মানুষের জীবিকার উৎস এবং পুরো দেশের মাছের অন্যতম বড় ভাণ্ডার মহেশখালীর প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মাছ যদি উধাও হয়ে যায়, যদি তারা খাদ্যের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তার দায় কে নেবে? ভূমির ক্ষতিপূরণ কীভাবে তাহলে যথেষ্ট হয়? স্থানীয় মানুষরা মাত্র ৩০ ভাগ ভূমির মালিক, বাকি ৭০ ভাগ মানুষ তো নানা কর্মসংস্থানে যুক্ত। ভূমির একটা কৃত্রিম দাম ধরা যায়, কিন্তু বাকি বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানের কী হবে? মহেশখালীর এই বিপুল সম্পদ, প্রাণ-প্রাচুর্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয় এক তরুণ, বুরহানউদ্দীন রাব্বানীর আহাজারি আকুতিভরা একটি সংগীতের রূপ নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে ঘরবাড়ি ছাড়ি যাইয়ুম হডে, সুন্দর এই মহেশখালী লৈ যাইবো কয়লাবিদ্যুতে (গানটি শুনুন t.ly/EDge3)। মিনামাতা সনদেও পারদের অন্যতম পাঁচটি উৎস চিহ্নিত করা আছে। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র তার মধ্যে অন্যতম।

অথচ এসব দূষণ প্রকল্পকে নিষিদ্ধ করেই মহেশখালীর বহুতর উন্নয়ন সম্ভব। মাত্র কয়েকটা উদাহরণ দিই। মহেশখালীর অন্যতম প্রধান পণ্য সামুদ্রিক মাছ, এখনো নিরাপদ। শুঁটকি ততটা নিরাপদ নয়। শুঁটকির প্রধান খাদ্যঝুঁকি একে সংরক্ষণে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক, তা প্রয়োগ করা হয় মাছি যেন শুঁটকিতে ডিম না পাড়ে তা নিশ্চিত করতে। শুঁটকি বানানো শ্রমঘন, সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া, তাই ব্যয়বহুল। জায়গাও লাগে বেশ, উন্মুক্ত স্থান বলে তা কখনো কখনো অপরিচ্ছন্ন।

সরকার নিজের উদ্যোগে আধুনিক কয়টি শুঁটকি কারখানা নির্মাণ করতে পারে, যেখানে কৃত্রিম তাপ ও বায়ুপ্রবাহ ব্যবহার করে অল্প সময়ে সুস্বাদু নিরাপদ শুঁটকি উদ্যোক্তারা বানাতে পারবেন সরকারকে সামান্য খাজনা দিয়ে। সরকারের প্রাথমিক বিনিয়োগ মাত্র কয়েক কোটি টাকা হলেও, দ্রুতই তা উঠে আসবে শুঁটকি বানানোতে প্রয়োজনীয় শ্রম, সময় ও স্থান সাশ্রয়ের কারণে। একই সঙ্গে উচ্চ আমিষে ভরপুর এই মহেশখালীর শুঁটকিকে তখন নিরাপদ জৈব উপায়ে প্রস্তুত খাদ্য হিসেবে পৃথিবীময় বহু গুণ উচ্চমূল্যে বিক্রি করা সম্ভব।

সুন্দরবনের মধুর আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি আছে। মহেশখালীর কৃষিপণ্যে আরও অনেক কিছু থাকলেও মৌ-চাষ এখানে তেমন নেই। এমন উপকূলীয় শ্বাসমূলীয় অরণ্যসমৃদ্ধ এলাকায় তা না হওয়ার কারণ নেই। কীটনাশকের জৈবিক বিকল্পের ব্যবস্থা করলে (এবং কয়লার বিষ অচিরেই অঞ্চলটাকে ধোঁয়াচ্ছন্ন না করলে) সামান্য পরিকল্পনায় এখানে বিপুল মধু তৈরি হতে পারে। সরিষা ও অন্যান্য কৃষিজাত ফুলের মধু তো আছেই, রাস্তার দুই ধারে সারা বছর ফুল পাওয়া যেতে পারে এমনভাবে ঋতু অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ, পাহাড়গুলোতে সামঞ্জস্যপূর্ণ বনায়ন সহজেই সুন্দরবনের মতোই মহেশখালীর মধুকেও একটা জগদ্বিখ্যাত সামগ্রীতে পরিণত করতে পারে।

আদিনাথের প্রাচীন মন্দির এই দ্বীপে। এটি বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ যেখানে পাহাড়, অরণ্য, সমুদ্র এই তিনটি প্রাকৃতিক পরিবেশের মিশেল ঘটেছে। নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়, নিরাপদ শুঁটকি, জৈব কৃষি এবং নিসর্গের টানে অজস্র মানুষ এখানে পর্যটনে আসবেন, যদি পরিবেশটি নিরাপদ করা যায় আর যাতায়াত খানাখন্দমুক্ত হয়। মহেশখালীর পানের বরজ, এর উপকূলীয় অরণ্য, এর সৈকত, এর টিলাময় প্রান্তর পর্যটকের আকর্ষণ হওয়ার কথা। এখানকার শ্বাসমূলীয় অরণ্যে হরিণ রাখা হয় না কেন, সেটাও একটা বিস্ময়। পাখিদেরও একটা সমৃদ্ধ আশ্রয় হতে পারে মহেশখালী। বিদেশি পর্যটকের জন্য এ ধরনের কেন্দ্রে বহু গুণ বেশি শুল্ক আদায় করা হয় সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে এবং তা থেকে কিছুটা ভর্তুকি দেওয়া হয় কৃষকদের, যাতে তারা সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করেন। আমাদের প্রতিবেশী ভুটান সেই পথ ধরেছে। সিকিমও।

সমুদ্রঘেরা একটি দ্বীপে কঠোর ভূমিকা নিলে বাংলাদেশের জন্য অনন্য একটা পরীক্ষাগার হতে পারে মহেশখালী। আবার দ্বীপের আবদ্ধ পরিবেশের কারণেই, একবার দূষণের কেন্দ্র হলে পুরো দ্বীপটির কোনো প্রাণীই পতঙ্গ থেকে মানুষ পর্যন্ত রেহাই পাবেন না। নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়, একটা সংরক্ষিত পরিবেশ অঞ্চল ঘোষণা করা হলে মহেশখালীর ধন ও মান বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে। মহেশখালীবাসীকেই দায়িত্ব নিয়ে তাই ভাবতে হবে, মহেশখালী বাংলাদেশের মিনামাতা হবে, নাকি প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার আদর্শ ভূখণ্ড হবে।

লেখক

ফিরোজ আহমেদ

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

subarnadin@gmail.com

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply