স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির অভিযোগ দিয়ে রোষানলে গোপালগঞ্জের সহকারী প্রধান কারারক্ষী

মনির হোসেন, ঢাকা : গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে বন্দীদের ঘিরে অনেকটা নীরবেই চলছে অনিয়ম দুর্নীতি। এর মধ্যে দেখা সাক্ষাতে অনিয়ম, কারা ক্যান্টিনে অতিরিক্ত দামে পণ্যে বিক্রি ছাড়াও পদে পদে অনিয়মের মাধ্যমে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কারারক্ষী থেকে শুরু করে জেলার পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। দিন দিন অনিয়মের মাত্রা বাড়তে থাকায় কারা অভ্যন্তরেও দেখা দিয়েছে ক্ষোভ-অসন্তোষ।
এর জেরে রোববার সকালে গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলার আতিকুর রহমান ও তার ‘সিন্ডিকেট’ এর বিরুদ্ধে একই কারাগারের সহকারী প্রধান কারারক্ষী টিটু মোল্লাহ অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগের চিত্র তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) মোট চার সরকারি প্রতিষ্ঠানে বেনামে চিঠি দিতে গিয়ে রোষানলে পড়েন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে সরেজমিন খোঁজ নিতে গেলে পাওয়া যায় এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। এ ঘটনার পর কারারক্ষীদের মধ্যে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
সূত্র জানিয়েছে, গোপালগঞ্জ সদর থানা পোস্ট অফিসের ডাক পিয়নসহ দুজনের (নাম জানা যায়নি) মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে জেলার দুপুরে কারাগারে জরুরি টিআই প্যাকেড ডাকেন। পোস্ট অফিসের ওই দুইজন কারাগারে সহকারী প্রধান কারারক্ষী টিটু মোল্লাহকে শনাক্ত করেন। এরপরই জেলার তাকে অকথ্য ভাষায় কথা বলে টিটুর কোমর থেকে বেল্ট এবং ক্যাপ (টুপি) খুলে নেন। এমনকি তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি জব্দ করেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত টিটু মোল্লাহকে কারাব্যারাকে সোহাগ নামের এক কারারক্ষী দিয়ে রাত থেকে ডিউটি দিয়ে নজরবন্দী করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গতকাল সোমবার বিকেল থেকে রাত সোয়া ৭টা পর্যন্ত এসব অভিযোগের সত্যতা জানতে জেলার আতিকুর রহমানের মোবাইলে একাধিক ফোন দেয়ার পরও তিনি টেলিফোন ধরেননি। পরে তিনি নিজেই রাতে টেলিফোন করেন প্রতিবেদককে। বেনামী চিঠি দেয়ায় সহকারী প্রধান কারারক্ষী টিটু মোল্লাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে পেপারস রেডি হয়ে আছে। আর কারাগারে দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে প্রশ্ন করার আগেই তিনি বলেন, আসলে আমি এ বিষয়ে কথা বলার কেউ না।
রাতে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশার সাথে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এর আগে গতকাল সোমবার বিকেল ৫টায় সহকারী প্রধান কারারক্ষী টিটু মোল্লার মোবাইলে দফায় দফায় ফোন করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। কারাগারের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, রোববার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলার আতিকুর রহমানের নির্দেশে কারাগারের ব্যারাক এবং বাইরে থাকা প্রধান কারারক্ষীসহ সবাইকে টিআই প্যারেডে উপস্থিত হতে জরুরি সংবাদ দেয়া হয়। নির্দেশনা পেয়ে ২৭ জন প্রধান গেটে টিআই প্যারেডে হাজির হন। এ সময় গোপালগঞ্জ সদর থানা পোস্ট অফিসের পিয়নসহ দুইজনও সেখানে আগে থেকেই হাজির ছিলেন বলে জানা গেছে। এ সময় জেলার সবার উদ্দেশে বলেন, আজ সকালে পোস্ট অফিসে জেলারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ লিখে কে বা কারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ মোট চারটি প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে দিয়ে এসেছে। এর মধ্যে কেউ আছে কি-না তা শনাক্তের জন্য পোস্ট অফিসের দুইজনকে এখানে ডাকা হয়েছে। তখন তারা সহকারী প্রধান কারারক্ষী টিটু মোল্লাকে শনাক্ত করেন। তারা শনাক্ত করার পরই জেলার তাকে অকথ্য ভাষায় কথাবার্তা বলেন এবং একটি চড়ও মারেন। এরপর তার বিরুদ্ধে লেকা দুর্নীতির ফিরিস্তি সংবলিত চিঠিটি সবার সামনে পড়ে শোনানো হয়। পরে পোস্ট অফিস থেকে আসা দুইজন দুর্নীতির চিঠিটি নিয়ে চলে যান। এ সময় জেলার কর্মচারীদের উদ্দেশে আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, একই ভাষায় এর আগেও কে বা কারা আমার বিরুদ্ধে আরো চার-পাঁচটি চিঠি বিভিন্ন দফতরে পাঠিয়েছে। সেগুলোর তদন্ত চলছে। এর মধ্যে আবার আজকে আমার নামে বেনামি চিঠি দেয়া হলো। এই প্রতিষ্ঠান থেকে তোমাদের রুটি রুজির ব্যবস্থা হচ্ছে। আর তোমরাই এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছো? এরপরই জেলার টিটু মোল্লার কোমরে থাকা বেল্ট ও মাথার টুপি খুলে ফেলেন। উল্লেখ্য সম্প্রতি ব্রাক্ষণবাড়িয়া কারাগার থেকে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার হয়ে গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে জেল সুপার হিসেবে যোগ দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি গত ৩০ নভেম্বর অবসরোত্তর ছুটিতে চলে যান। তবে এ ঘটনায় গতকাল বিকেল পর্যন্ত টিটু মোল্লাহকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে কি-না তা জানা যায়নি।
ওই টিআই প্যারেডে উপস্থিত ছিলেন এমন একাধিক কারারক্ষী গতকাল নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, টিটু মোল্লা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের সচিব স্যারের কাছে কারাগারের দুর্নীতি নিয়ে যে চিঠি লিখে সদর পোস্ট অফিসে রোববার সকাল ১০টায় জমা দিয়ে এসেছিলেন, সেই তথ্যটি পোস্ট অফিসের ডাক পিয়ন ফাঁস করে দেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, চিঠিতে জেলারের লোক হিসেবে কারাগারে পরিচিত রিজার্ভ হাবিলদার আতিয়ার মাস্টার বন্দীর ওকালতনামায় সই করাতে ১০০ টাকা, বন্দীর সাথে ডাবল দেখা করাতে প্রতিবার ১০০ টাকা করে নেন। কারাগারে বাইরের খাবার এবং কাপড় দিতেও তিনি নগদ টাকা নেন। একইভাবে রব ওস্তাদ জামিনে বন্দীদের ছাড়তে এক হাজার থেকে পনের শ’ টাকা নেন বলে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। তারা বলেন, চিঠিটি সবার সামনেই পড়ে শোনানো হয়। সেখানে জামিনে কোনো বন্দীর স্বজন টাকা না দিলেই অহেতুক হয়রানি করা হয় এবং রাত ৮/৯টার দিকে মুক্তি দেয়া হয়। এ ছাড়া কারাগারের ক্যান্টিন পরিচালনা করছেন আল আমিন নামের একজন কারারক্ষী। ক্যান্টিন থেকে অতিরিক্ত দামে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়। এর মধ্যে একটি ৩৫ টাকার সেভেন আপ ৪৫ টাকায় আর নুডলস ৩০ টাকারটা ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। এভাবে প্রতিটি পণ্যে দ্বিগুণ দামে নেয়া হয় বলে চিঠিতে বলা হয়েছে। আসামিদের প্রতিদিনের খাবারে ডাল-চাউল যে পরিমাণ দেয়ার কথা তা দেয়া হচ্ছে না। সপ্তাহে একদিন ইলিশ মাছ দেয়ার কথা। কিন্তু সেটির বদলে দেয়া হচ্ছে পাঙ্গাস মাছ। কারাগারে স্টাফদের চাউল গম দেয়া হয় নি¤œমানের। এ ছাড়া রয়েছে সিটভাড়া বাণিজ্য। এর মধ্যে বন্দীর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসা স্বজনদের কাছ থেকে মসজিদের দেয়ার জন্য টাকা আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয় ওই চিঠিতে। এসব অভিযোগের সত্যতা মেলাতে রোববার বেলা ২টার দিকে সরেজমিন কারগারের সাক্ষাৎ কক্ষে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যায় বন্দীর সাথে স্বজনদের কথা হলেও কেউ কারো কথা ভালোভাবে বুঝতে পারছেন না। পাশেই সাক্ষাৎ স্লিপ কেটে প্রতিজনের কাছ থেকে মসজিদের দান বাক্সে ১০ টাকা করে ফেলতে অনুরোধ করছেন সাদা পোশাকে কতর্ব্যরত এক ব্যক্তি। এ সময় একজন স্বজন জানতে চান এই টাকা মসজিদের উন্নয়নে ব্যয় হয় কিনা? তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি তাকে বলেন, গত মাসেও ২৭ হাজার ৫০০ টাকা উঠেছে। পুরো টাকাই মসজিদের কাজে ব্যয় হয় বলে তাকে জানান তিনি। তবে বন্দীর স্বজনদের সাথে কথা বললে তারা এ প্রতিবেদকের কাছে বলেন, কারগারে তেমন সমস্যা নেই। শুধু প্রতিটি পণ্যের মূল্যে বাজার থেকে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply