হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর জীবনের ৬টি অলৌকিক ঘটনা

ধর্ম, কর্ম ও জীবন:

যুগে যুগে মানবজাতিকে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়া’লার নির্দেশিত সঠিক ধর্মের পথে নিয়ে আসতে আল্লাহ তায়া’লা অনেক নবী ও রাসুলদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাদের সকলের একই দায়িত্ব পালন করেছেন, কিভাবে আল্লাহ তায়া’লার ইবাদাত করতে হয় এবং সৎ পথে জীবনযাপন করতে হয় – এগুলো মানুষকে শিক্ষা দেয়া। এই শিক্ষা দেয়ার সময়, প্রতিটি কাজে একাগ্রচিত্ততা এবং সততার যে অনুকরণীয় নজির স্থাপন করে দেখিয়েছেন, তা দেখে তাদের শত্রুও তাঁদেরকে সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসাবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।

“নিরাকার সৃষ্টিকর্তা” এর অস্তিত্ব প্রমাণ করার মিশন নিয়ে তাঁরা পৃথিবীতে এসেছিলেন, সে জন্য মানব চরিত্রের অতুলনীয় সৌন্দর্য্য তাদের অন্তরে গ্রোথিত করে দেয়া হয়েছিল। নবী-রাসূলদের ঐশী দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষের সন্দেহ দূর করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে তার নির্দেশে তাদেরকে কিছু সময়ের জন্য অলৌকিক ক্ষমতা (মু’যেযা) প্রদান করা হয়েছিল। অতীতে সংঘটিত এই সকল কিছু অলৌকিক ঘটনার মধ্যে থেকে কিছু ঘটনার কথা আল্লাহ তায়া’লা পবিত্র কুর’আন শরীফে উল্লেখ করেছেন। মুসলিমগণ এই সকল মু’যেযাকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জীবদ্দশায় বেশ কিছু মু’যেযার কথা আমরা কুর’আন ও হাদীসের বর্ণনায় জানতে পারি। এই আলৌকিক ঘটনা পৃথিবীর কোন মানুষের পক্ষে পুবরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়। তাঁর জীবদ্দশার পুরোটা সময়ে অসংখ্যবার এই সব অলৌকিক ঘটনাগুলো পুনরাবৃতি হয়েছে। এই সব ঘটনাগুলোর মধ্যে থেকে এই লেখায় পাঠকদের জন্য বিশেষ ৬টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১. চাঁদ দ্বিখণ্ডিতকরণ:

মক্কার অবিশ্বাসীরা হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে চ্যালেঞ্জ করে আবদার জানাল যে, তিনি যেন তার নবুয়তপ্রাপ্তির প্রমাণস্বরূপ এমন কোন অলৌকিক ঘটনা তাদের সামনে উপস্থাপন করেন, যাতে তারা বুঝতে পারে, মুহাম্মদ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত একজন নবী। তখন তিনি আঙ্গুলের ইশারায় দিয়ে আকাশের চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে দেন।

“মক্কার লোকেরা আল্লাহর বার্তাবাহককে অনুরোধ জানাল একটি অলৌকিক ঘটনা তাদেরকে দেখাতে। তিনি তাদেরকে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে দেখালেন”।

সহীহ আল বুখারী

চাঁদের এই দ্বিখণ্ডিত অবস্থায় কিছুক্ষণ থাকার পর এটি আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। যদিও ঘটনাটি মক্কার অবিশ্বাসীদের চোখের সামনে ঘটেছিল; ঘটনাটি ছিল ক্রিস্টালের মত স্বচ্ছ; তবুও তাদের বক্র হৃদয় ঘটনাটিকে মেনে নিতে পারে নাই। অবিশ্বাসীরা মুহাম্মদ (সা.) কে “জাদুকর” উপাধিতে ভূষিত করে।

২. লাইলাতুল ইসরা ও ঊর্ধবাকাশে ভ্রমন:

ঐশী বার্তাবাহক জিব্রাইল (আ.) এর সাথে করে এক রাতে মুহাম্মদ (সা.) ঊর্ধবাকাশে ভ্রমন করেছিলেন। প্রথমে তাঁরা মক্কা থেকে জেরুজালেমে ভ্রমন করেন; সেখান থেকে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়া’লার সাথে সাক্ষাতের উদ্দ্যেশ্যে ঊর্ধবাকাশে গমন করেন।

সাক্ষাৎ শেষে একই রাত্রে তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসেন।

৩. খেজুর গাছ যেটা কেঁদেছিল:

হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন সাহাবীদের উদ্দ্যেশ্যে বয়ান করতে (বক্তৃতা দিতেন) তখন একটি গাছের গুড়িতে হেলান কথা বলতেন। পরে সাহাবীগণ তাঁর জন্য একটি মিম্বর (ডায়াস) তৈরী করেন। একদিন শুক্রবারে মুহাম্মদ (সা.) সেখান থেকে বয়ান দেয়ার জন্য উঠলেন। উঠবার সময় তিনি একটি কান্নার আওয়াজ পেলেন; অনেকটা উটের বাচ্চার কান্না। ব্যাপার কি দেখার জন্য তিনি নিচে নেমে এলেন এবং যে গাছের গুঁড়ি দিয়ে মিম্বরটি বানানো হয়েছে, সেখানে গেলেন।

“নবীজী তার বক্তৃতার সময় একটি খেজুর গাছের গুড়ির পাশে দাঁড়াতেন। একটি মঞ্চ তাঁর জন্য রাখা হয়, তিনি শুনতে পেলেন গাছের গুড়িটি একটি গর্ভবতী উটের মত কান্না করছে। নবীজী সেখান থেকে নেমে গেলেন এবং তার উপরর হাত রাখলেন।”

সহীহ আল বুখারী

৪. মুহাম্মদ (সা.) এর হাত থেকে পড়া পানিতে তৃষ্ণা নিবারণ:

হুদায়বিয়ার সন্ধি যেদিন স্থাপিত হয় সেদিন মানুষজন অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে। মুহাম্মদ (সা.) তার অজু কেবলমাত্র শেষ করেছেন। এ সময় কিছু মানুষ তার কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসল।

তিনি তাদের ছুটে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললেন যে, তাদের কাছে শুধু এক বদনা পানি অবশিষ্ট রয়েছে যা দিয়ে তাদের সবার ওযু ও পান করার জন্য যথেষ্ট নয়।

তিনি তখন তার হাত বদনার মধ্যে রাখলেন এবং আল্লাহ তায়া’লার ইচ্ছায় বদনা থেকে ঝরনার মত পানি প্রবাহিত হতে লাগল। সেই ঝরণা ধারা থেকে উপস্থিত সকলে সেদিন পানি পান ও ওযু করলেন।

“আল-হুদাইবিয়া সন্ধির দিনে মানুষজন খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ল। নবী (সা.) এর সামনে রক্ষিত পাত্রের পানি দিয়ে তিনি ওযু সম্পন্ন করলেন। ওযু শেষ হওয়ার পরপরই মানুষজন তার কাছে হন্তদন্ত হয়ে আসল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি ব্যাপার?” তারা বললেন, “ওযু করা বা পান করার মত কোন পানি তাদের কাছে নেই। আপনার কাছে পানি আছে নাকি?” এ কথা শুনে তিনি তার হাত তার পাত্রের মধ্যে রাখলেন; আর তার হাতের আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে ঝরণার মত করে পানি বের হতে লাগল। আমরা সকলেই সেই ঝরণাধারা থেকে পানি পান করলাম এবং ওযু করলাম। আমি জাবিরকে (রাযিঃ) জিজ্ঞাসা করলাম, “আমরা কত জন উপস্থিক ছিলাম?” তিনি বললেন, “আমরা যদি এক লক্ষ মানুষও থাকতাম, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত, কিন্তু আমরা ১৫০০ ছিলাম”

সহীহ আল-বুখারী

৫. বিয়ের খাবারের সময় মুহাম্মদ (সা.) এর অলৌকিক ঘটনা:

যখন হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে জয়নব বিনতে জাহশ (রাযি.) এর বিয়ে সম্পন্ন হয় তখন আনাস বিন মালিক (রাযি.) এর মাতা উম্মে সুলাইম তাদের দুই জনের আপ্যায়নের জন্য “হায়িস” প্রস্তুত করে দেন। মদিনার সর্বোতকৃষ্ট খেজুর দিয়ে এটি তৈরী করা হত।

তাদের জন্য হায়িস দেখে মুহাম্মদ (সা.) আনাস বিন মালিক এর নিকট হতে ভাণ্ডটি নিয়ে তাকে তার সব বন্ধু-বান্ধবদের আমন্ত্রণ করতে বললেন। সেদিন আনাস (রাযি.) এর আমন্ত্রণে ৩০০ জন অতিথি উপস্থিত হয়েছিলেন।

মুহাম্মদ (সা.) তাদের সকলকে পেট ভরে সেই হায়িস থেকে খাওয়ালেন। সকলের খাওয়া শেষ হলে মুহাম্মদ (সা.) আনাস (রাযি.) কে ভাণ্ডটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে বললেন। আনাস (রাযি.) ভাণ্ডটি সরিয়ে নেয়ার পর বুঝতে পারলেন না সেই ভাণ্ডটিতে থাকা খাবারগুলো তিনিই দিয়েছিলেন কিনা এবং সেখানে থাকা খাবারের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে কিনা।

৬. পবিত্র কুরআন শরীফই মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা:

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জীবনে সংঘটিত উপরে বর্ণিত প্রতিটি ঘটনাই একক বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর, তথাপি কোন ঘটনাই মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের সর্বাপেক্ষা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত অলৌকিক ঘটনা, পবিত্র ঐশিগ্রন্থ কুরআন, এর সাথে তুলনা করা চলে না। কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা তার জীবনের জীবনের সর্বাপেক্ষা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ ব্যাপারে কোন মুসলিমের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক হবে না।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্বের বিষয়টি প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও কুরআনের ভাষাতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতাও বিভিন্নভাবে বিভিন্নভাবে প্রমাণিত। পৃথিবীতে কুরআনই একমাত্র ধর্ম গ্রন্থ যা মানবজাতির সার্বিক কল্যানের জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে অবতীর্ণ করা হয়েছে। আর, সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়া’লা স্বয়ং এই কুরআনকে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত অবিকৃত রাখার অঙ্গীকার করেছেন।

সর্বোপরি, কুরআনের মধ্যেই আল্লাহ তায়া’লা মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রেখেছেন, সাধ্য থাকলে এর অনুরূপ একটি কুরআন রচনা করার জন্য। আল্লাহ তায়া’লার এই চ্যালেঞ্জটি বিগত ১৪০০ বছর ধরে কেউ ভাঙ্গতে পারেনি; কোনদিন পারবেও না।

এ কারণেই পবিত্র কুরআন হল রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জীবনের সর্বাপেক্ষা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত অলৌকিক ঘটনা।

আল্লাহ তায়া’লা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,

“বলুনঃ যদি মানব ও জ্বিন এই কোরআনের অনুরূপ রচনা করে আনয়নের জন্যে জড়ো হয়, এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়; তবুও তারা কখনও এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।”

আল-কুরআন। সুরা আল-ইসরা। আয়াত ৮৮
Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply