হলি আর্টিজানে হামালার রায় কাল: সর্বোচ্চ শাস্তি চায় রাষ্ট্রপক্ষ

সিবিএল২৪ : রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার রায় ঘোষণা হবে আগামীকাল বুধবার।

ঢাকার সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এই রায় ঘোষণা করবেন।

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে সারাদেশে সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ সদর। বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে কারাবন্দী জঙ্গিদের।

ঘটনা সম্পর্কে জানেন কিংবা ঘটনা দেখেছেন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জানেন- এরকম ১১৩ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।

এদের মধ্যে ১৭ জন সাক্ষী ঘটনার দিন হলি আর্টিজানের ভেতর অবস্থান করছিলেন। তাদেরকে কমান্ডো বাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাব জীবিত উদ্ধার করে। রায় ঘোষণার দিন ধার্য করার আগে এই মামলার ৭৫টি আলামত আদালত পর্যবেক্ষণ করে।

সস্ত্রাস দমন ট্রাইবুনালেরর পাবলিক প্রসিকিউটর গোলাম সারোয়ার খান জাকির বলেন, সাক্ষ্য প্রমাণে তা প্রমাণ করতে পেরেছি যে আসামিরা অপরাধী। আশা করছি আট আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিবেন বিচারক।

অপরদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, সাক্ষীরা কেউ আসামিদের নাম বলেনি। তাদেরকে দেখেনিও কেউ। শুধুমাত্র নির্যাতন করে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এই মামলায় সাজা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। জেরা ও যুক্তি উপস্থাপনে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে আসামিরা অপরাধ করেনি। আশা করছি তারা খালাস পাবে।

হামলার কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে চার্জশিটে বলা হয়, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী। ভয়াবহ এই হামলায়  চিহ্নিত ২১ জনের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি অংশ নেন। বাকিরা হামলার পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র-বোমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন। হামলার মূল প্রশিক্ষক (মাস্টার ট্রেইনার) মেজর জাহিদ কিংবা তানভির কাদেরি, নুরুল ইসলাম মারজান ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসামি। গুলশান হামলার জন্য বগুড়ার দুই জঙ্গিকে নিয়োগ করেন রাজীব আর বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া ও জঙ্গিদের উদ্ধুদ্ধও করেন তিনি। জঙ্গি সাগর সীমান্তের ওপার থকে আনা অস্ত্র ঢাকায় মারজানের কাছে পৌঁছান। বাশারুজ্জামান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে দুই দফা হুন্ডির মাধ্যমে আসা ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন এবং সেই টাকা গুলশান হামলায় ব্যবহৃত হয়। যারা এই হামলা চালিয়েছিল তারা ৫ থেকে ৬ মাস ধরে পরিকল্পনা করেছিল। সেখানে হামলা চালানো জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল  আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বিশ্বের বড় বড় জঙ্গি সংগঠনের অনেক অস্ত্রশস্ত্র আছে। তাই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এসব অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে এমন ধারণা ছিল জঙ্গিদের। আর সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেও জঙ্গিরা এই হামলা চালিয়েছিল। এতে বিদেশি বিনিযোগকারীরা এদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। এতে সরকার আরও বিপদে পড়বে। তামিম ছিল এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। আন্তর্জাতিকভাবে কারও সঙ্গে তারই যোগাযোগ থাকার কথা ছিল। হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিমকে ধরার সময় তার ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো অভিযানের আগেই ধ্বংস করে পুড়িয়ে দেয়।

অভিযানে নিহত হলি আর্টিজানের পাচক সাইফুল ইসলামকে শুরুতে সন্দেহের তালিকায় রাখা হলেও তার সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ তদন্তকারীরা পাননি। এমনকি জঙ্গি হামলার পর আটক হলি আর্টিজানের ডিশ ক্লিনার জাকির হোসেন শাওনের কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। হামলায় অংশ নেওয়া নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি নিবরাজ ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল নিহত হন ওই অভিযানে। আর পরে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরী,  মেজর (চাকরিচ্যূত) জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান, আবু রায়হান তারেক, সারোয়ার জাহান, বাসারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান নিহত হন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় অতর্কিত হামলা করে পাঁচ জঙ্গি। তারা ভেতরে থাকা সবাইকে জিম্মি করে। পুলিশের তাৎক্ষণিক অভিযানের সময় জঙ্গিদের হামলায় নিহত হন ডিবি’র সহকারী কমিশনার রবিউল করিম ও বনানী থানার ওসি সালেহ উদ্দিন। এছাড়াও আহত হয়েছেন তৎকালীন র‌্যাব-১ এর অধিনায় লে. কর্নেল (বর্তমানে কর্নেল) তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ, পুলিশের গুলশান জোনের এডিসি (বর্তমানে উপ-কমিশনার) আব্দুল আহাদসহ অনেকেই।

পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে অভিযানে রোহান ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বীর, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল নামে পাঁচ জঙ্গি নিহত হন। পরে হলি আর্টিজান থেকে ১৭ বিদেশি ও চার বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা। ঘটনার দুই দিন পর গুলশান থানার এসআই উত্তম কুমার বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

দুই বছর ২২ দিন তদন্ত শেষে গত বছরের ২৩ জুলাই তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ (সংশোধনী ২০১৩) এর ৬(২)/৭/৮/৯/১০/১২/১৩ ধারায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। চার্জশিটে অভিযুক্ত ১৩ জন ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন। জঙ্গি হামলার অভিযোগ থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক রেজাউল হাসনাত করিম ও কানাডার টরেন্টো ইউনিভার্সিটির ছাত্র তাহমিদ হাসিব খানকে অব্যাহতি দেয়া হয়। অভিযুক্ত আট আসামি হলেন—গাইবান্ধার জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, নওগাঁর আসলাম হোসেন ওরফে আসলামুল ইসলাম ওরফে রাশেদ ওরফে র‌্যাশ, কুষ্টিয়ার আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, জয়পুরহাটের হাদীসুর রহমান ওরফে সাগর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, বগুড়ার রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, একই জেলার মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও রাজশাহীর শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ। তারা সবাই কারাগারে আছেন।

এমআই/এসবি

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply