হাজারো অভিযোগ নিয়ে পর্যটনবাহী “বে-ওয়ান” জাহাজের যাত্রা; অসন্তোষ অতিথিরা

সাধারণ যাত্রীদের খাবারের জন্যে ভীড় ; অনেকেই খাবার না পেয়ে উপোষ থেকেছে আবার অনেকেই খাওয়ারব১ বোতল পানিও পায়নি।

চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমী ঘাটে জাহাজটির উদ্বোধন করেন নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালেদ মাহবুব চৌধুরী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, কক্সবাজা-২ এর সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজার- ১ এর সংসদ সদস্য জাফর আলম, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মজিবুর রহমান সহ নেতৃবৃন্দরা উপস্থিত ছিলেন।


উদ্বোধনের দিনেই চরম অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা দিয়ে শুরু করেছে পর্যটনবাহী “বে-ওয়ান” জাহাজের যাত্রা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর থেকেই সবধরণের কার্যক্রমেই পরিলক্ষিত হয়েছে অনিয়মের। বিশেষ করে অতিথিদের মাঝে শ্রেণী বৈষম্য করাই চরম অসন্তুষ দেখা দিয়েছে অন্যান্য অতিথিদের মাঝে।

রবিবার (২০ডিসেম্বর) বিকেল ৩টায় চট্টগ্রামের আনোয়ারার মেরিন একাডেমির জেটিঘাটে জাহাজটির উদ্বোধন শেষে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। এই জাহাজটি কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে নিয়মিত যাত্রী পরিবহণে যুক্ত থাকবেন বলে জানা যায়।

প্রায় ৮০০/৯০০ অতিথি নিয়ে যাত্রা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেেই ভিআইপি প্রথার প্রচলন শুরু হয় জাহাজটিতে। সাধারণ অতিথিদের সাথে খারাপ আচরণ করা শুরু করে কর্তৃপক্ষের লোকজন। পুরো জাহাজ জুড়ে ছিলনা কোন নিয়ম শৃঙ্খলা। পর্যাপ্ত খাবার ও পানি থাকা সত্বেও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিথিদের খাবার ও পানি দেয়া হয়নি। এতে করে বয়স্ক, ডায়াবেটিসের রোগী ও শিশুদের বেশ কষ্ট পোহাতে হয়েছে।

বয়স্ক ও শিশুদের জন্য খাবার না পেয়ে যাত্রীদের প্রতিবাদ

জাহাজের দ্বিতীয় তলায় ক্যান্টিনে (বুফে) খাবার দেয়ার নাম করে কর্তৃপক্ষরা শুরু করেছে আরেক নাটকীয়তা। এ নাটকীয়তার গ্যাড়াকলে পড়ে সারারাত খাবার সংকটে পড়েছে সাধারণ অতিথিরা। বিশেষ করে খাবার পানির তীব্র সংকটে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় অনেককে। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খাবারের জন্য কেন্টিনের সামনে খুধার্ত মানুষের হাহাকার করতে দেখা গেছে। ক্ষুধার তাড়নায় একটি জিলেপি ও পিঠার জন্য শত শত মানুষের হাত পাততে হয়। এই করুণ অবস্থা সৃষ্টি করার জন্য যাত্রীরা চরমভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। যাত্রীদের এই হাহাকার উপেক্ষা করে তথাকথিত ভিআইপিদের জন্য খাবার নিয়ে যায় কর্তৃপক্ষের লোকজন। এসময় কয়েকজন অতিথি প্রতিবাদ করলে উল্টো যাত্রীদের দিকে তেড়ে আসে জাহাজ কর্তৃপক্ষের কয়েকজন।

আক্ষেপ করে শাহরিয়ার, মিজান, আহসান সহ কয়েকজন যাত্রী বলেছেন- “আমাদের সাথে ছোট ছোট বাচ্চা আছে। খাবারের জন্য তারা কান্না করছে। জাহাজে বয়স্ক যাত্রীও আছে। জাহাজ কর্তৃপক্ষ বলেছিল জাহাজে পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা থাকবে। তাই নিজেদের কাছে খাবার রাখা হয়নি। এখন সাগরের মাঝপথে নিরুপায় হয়ে গেলাম। কোনমতে কক্সবাজার পৌঁছাতে পারলেই হলো।

এদিকে ঢাকা থেকে আসা কামাল হোসেন নামের এক যাত্রী বলেছেন-“জাহাজ কর্তৃপক্ষ আমাদের দাওয়াত করে এভাবে অপমান করবে তা ভাবিনি। খাবার সংকট দেখানো এবং খাবারের জন্য মানুষের ভীড় সৃষ্টি হওয়ার মত অবস্থা করাটি কোন ভাবেই কাম্য হয়নি। উদ্বোধনের দিন যে খারাপ আচরণ করেছে কর্তৃপক্ষ, তাতে করে তারা কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে মানসম্মত যাত্রী সেবা প্রদান করতে পারবে বলে মনে হয়না।”

কক্সবাজার থেকে আসা একজন অতিথি সাংবাদিক অন্তর দে বিশাল বলেন- ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে,পানি স্টক রাখা রুম থেকে জোর করে পানির ২ টা বোতল নিয়ে ছিলাম।সবাই মিলে বোতল নিয়ে টানাটানি করে তৃষ্ণা মিটাইতে ১ মিনিট ও সময় লাগে নাই!বলতে গেলে জাহাজে মালেশিয়া যাওয়ার অভিজ্ঞতা।

“বে-ওয়ান” জাহাজে কক্সবাজার থেকে বিভিন্ন প্রিন্ট ইলেক্ট্রনিক মিড়িয়ার সাংবাদিকদের দাওয়াত করা হয়। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহে জাহাজের বিভিন্ন সেকশনে প্রবেশ করতে গেলেই বাঁধা প্রদান করে কর্তৃপক্ষের লোকজন। তারা জানান, এসব জায়গায় সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি নেই। কেন নেই এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে, তারা উত্তর দিতে বাধ্য নয় বলে জানান।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনে শিল্পী রবি চৌধুরী

অপরদিকে জাহাজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। এতে গান পরিবেশন করেন শিল্পী রবি চৌধুরী, শিল্পী লুইপা ও চট্টগ্রামের মেয়ে লিজা। তবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি জমকালো হলেও অতিথিদের মাঝে বিষন্নতার চাপ ছিল। মির্জা তারেক নামের এক যাত্রী বলেন- “মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও পেটের ক্ষুধার তাড়নায় সাংস্কৃতিক ক্ষুধা চাপা পড়েছে। তাই অন্তত সময় পার করার জন্য বসে আছি।”

পরে রাত সাড়ে ১২ টায় অতিথিদের খাবারের ব্যবস্থা করে। এসময় খাবারের সংকট হলে কর্ণফুলী জাহাজে করে কক্সবাজার থেকে খাবারের প্যাকেট আনা হয়। একই জাহাজে করে বঙ্গোপসাগর থেকে যাত্রীদের কক্সবাজারের নুইন্যাছড়ায় রাত আড়াইটার দিকে নামানো হয়। এতে করে গাড়ী না পেয়ে আরেক ভীতিকর অবস্থায় পড়ে যাত্রীরা। বেশির ভাগ যাত্রীদের ৫/৭ কি.মি. পথ পায়ে হেঁটে আসতে হয়। অনেক যাত্রীদের হোটেলে রুম ভাড়ার জন্য ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায়।

শুরুর দিনেই এমন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দিয়ে শুরু হওয়া বে-ওয়ান জাহাজের পথচলা কতটুকু নিরাপদ ও মানসম্মত হবে সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply