১০০’রও বেশি খুন! প্রমাণ লোপাটে লাশ কুমিরকে খাওয়াত এই ‘গুণধর’ ডাক্তার

কীর্তিমান আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক (Doctor)! চিকিৎসায় হাতযশ হয়নি। তাই আয় বাড়াতে গ্যাসের এজেন্সি চালু করেছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। প্রতারণার ফাঁদে পরে লক্ষাধিক টাকা গচ্ছা গিয়েছিল তার। সেই টাকা উশুল করতে নকল গ্যাসে এজেন্সি ফেঁদে বসেছিল সে। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল মানুষ মারার খেলা। এখনও পর্যন্ত শতাধিক খুন করে ফেলেছে উত্তেরপ্রদেশের ওই চিকিৎসক। নিজেই হিসেব রহাখতে পারেনি। তাই পুলিশি জেরায় অকপট স্বীকারোক্তি, পঞ্চাশটা খুন করার পর আর হিসেব রাখিনি! আর লাশ লোপাটের কায়দাটা আরও হাড়হিম করা। মৃতদেহ গায়েব করতে নদীতে ভাসিয়ে দিত, আর কুমীরে খুবলে খেত সেই দেহ।

ঠিক কতজন মানুষকে খুন করেছে; ভারতের একজন সিরিয়াল কিলার নিজেও তা জানে না। কারণ সংখ্যাটা পঞ্চাশ পেরোনোর পরে সে গোনাই ছেড়ে দিয়েছিল! পুলিশের দাবি ৬২ বছরের দেবেন্দ্র অন্তত ১০০ মানুষকে খুন করেছে। অবশেষে দিল্লির বাপরোলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

দিল্লি পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) রাকেশ পাওয়েরিয়াকে উদ্ধৃত করে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিক নিজের হাতে খুন হয়তো নয়, তবে খুনি দলের পাণ্ডা ছিল দেবেন্দ্র। শিকার ছিল মূলত ট্যাক্সিচালক ও ট্রাকচালকেরা। ডিসি রাকেশ দাবি করেন, উত্তরপ্রদেশের কাসগঞ্জে দেবেন্দ্রর দলের লোকেরা যাত্রী সেজে ট্যাক্সিতে উঠত। নিরিবিলি কোনও জায়গায় ট্যাক্সি থামাত। তারপর চালককে খুন করে ট্যাক্সিটা নিয়ে পালাত। মৃতদেহটা ভাসিয়ে দেওয়া হত হাজারা খালে। ট্যাক্সিচালকের মৃতদেহ লোপাট করে দিত খালে থাকা কুমিরের দল। আর ট্যাক্সিগুলো বেচে দেওয়া হত ২০-২২ হাজার টাকায়। এলপিজি সিলিন্ডার বোঝাই আস্ত ট্রাকও লুট হতো একইভাবে। চালককে মারা হতো, ডাক্তারের ভুয়ো গ্যাস এজেন্সিতে নামানো হত সিলিন্ডার। ট্রাকগুলোকে নিয়ে গিয়ে ভেঙে ফেলা হত। 

আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, আয়ুর্বেদ ও সার্জারির ডিগ্রি রয়েছে দেবেন্দ্রর নামের পাশে। মাঝে মাঝে ক্লিনিকও চালিয়েছে। কিন্তু ডাক্তার হিসেবে সুনামের বদলে তার পরিচিতি ‘বদনামে’। দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের মতো রাজ্যে তার নামে মোট কতগুলো মামলা ঝুলছে, পুলিশও ঠিক জানে না। খুন, অপহরণ, কিডনি পাচার চক্রের সদস্য, ভুয়ো এলপিজি এজেন্সির ব্যবসা— অভিযোগ অজস্র। তেমনই এক খুনের মামলায় গত ১৬ বছর ধরে সে যাবজ্জীবন জেল খাটছিল জয়পুরের সেন্ট্রাল জেলে। গত জানুয়ারিতে ২০ দিনের প্যারোলে বেরিয়ে পুলিশের নাগালের বাইরে চলে যায় দেবেন্দ্র। মঙ্গলবার দিল্লির বাপরৌলা এলাকা থেকে ‘ফেরার আসামি’ দেবেন্দ্রকে গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের টেবিলে আনা হয়েছিল রাতে। সেই পর্ব শেষ হতে হতে ভোর। ঠান্ডা মাথায়, ‘তদন্তকারীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা’ করেছে সে। নিজের অপরাধের কথা বলতে গিয় বলেছেন, ‘কত জনকে মেরেছি, পঞ্চাশের পরে তা গোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম।’

দেবেন্দ্রের প্রথম স্ত্রী ও সন্তানেরা তার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিলেন প্রায় ১৬ বছর  আগে। পুলিশ জানিয়েছে, উত্তরপ্রদেশ থেকে দিল্লিতে এসে প্রথমে মোহন গার্ডেনে এক পরিচিতের বাড়িতে উঠেছিল দেবেন্দ্র। তারপর আত্মীয়া এক বিধবা নারীকে বিয়ে করে থাকতে শুরু করে বাপরৌলায়। দেবেন্দ্রর দাবি, নতুন করে জীবন শুরুর চেষ্টা করছিল সে। শুরু করেছিল জমি-বাড়ির কারবার। পুলিশের দাবি, দেবেন্দ্রের অন্ধকার জগতের খবর তার দ্বিতীয়া স্ত্রী জানতেন। 

আলিগড়ের পুরেনি গ্রামে দেবেন্দ্রের আদি বাড়ি। বিএএমএস ডিগ্রি বিহারের সিওয়ানের।

জেরায় দেবেন্দ্র জানায়, ১৯৮৪ সালে বিহারের সিওয়ান থেকে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসারক ডিগ্রি অর্ঝন করেছিল। জয়পুরে জনতা হাসপাতাল নামে একটি ক্লিনিক খোলে। পরে ১৯৯৪ সালে গ্যাস সংস্থার ডিলারশিপ পেতে ১১ লক্ষ টাকা খরচ করে।কিন্তু সে প্রতারণার শিকার হয়। সেই টাকা উশুল করতে পরের বছরই দেবেন্দ্র আলিগড়ে একটি নকল গ্যাস সংস্থা চালু করে।

সেই ব্যবসায় গ্যাস সিলিন্ডার জোগার করতে সিলিন্ডার ভরতি ট্রাক চালকদের খুন করল। আর ট্রাকে থাকা সিলিন্ডার লুঠ করত সে। দেবেন্দ্রকে তখন নকল গ্যাস এজেন্সি চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জামিন পেয়ে ফের একটি নকল গ্যাস এজেন্সি শুরু করে সে। তখনও তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর জেল থেকে বেরিয়ে দেবেন্দ্র কিডনি পাচারকারী গ্যাং-এ যোগ দেয়। এবং জয়পুর, বল্লবগড় ও গুরুগ্রামে ১২৫ জনের কিডনি প্রতিস্থাপন করে।
এক একটি কিডনি প্রতিস্থাপনে ৫ থেকে ৭ লক্ষ টাকা পেত দেবেন্দ্র। ২০০৪ সালে গুরুগ্রামের আনমোল নার্সিংহোমে অভিযান চালানো হলে তাকে ধরা হয়। সেই মামলায় দীর্ঘদিন জয়পুরের জেলে বন্দী ছিল। কিছুদিন আগে প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিল সে। তারপর পালিয়ে ছিল সে। ১৯৮৪ সালে জয়পুরে গিয়ে সে একটা ক্লিনিক খোলে। কয়েক বছর পর ১৯৯২-এ গ্যাসের ডিলারশিপ নিতে গিয়ে ১১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে ঠকে যায় দেবেন্দ্র। সেই বিপুল ক্ষতি সামলে নিতেই তিন বছর পরে আলিগড়ে ছারা-য় নিজেই ভুয়া এলপিজি সংস্থার ব্যবসা খুলে বসে সে। আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, সম্ভবত সেই প্রথমবার দেবেন্দ্র পা বাড়ায় অন্ধকার জগতে। ১৯৯৪ থেকে জড়িয়ে পড়ে কিডনি পাচার চক্রে। জয়পুর থেকে বল্লভগড় হয়ে গুরুগ্রাম পর্যন্ত বিছিয়ে থাকা সেই চক্রের হয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২৫টি বেআইনি কিডনি প্রতিস্থাপন করে দেবেন্দ্র। প্রতি অস্ত্রোপচারের পারিশ্রমিক ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। 

এ সবের মধ্যেই আলিগড়ে বেআইনি গ্যাসের ব্যবসা ধরা পড়ায় দেবেন্দ্র গ্রেফতার হয়। তা সত্ত্বেও সে ২০০১-এ উত্তরপ্রদেশের আমরোহায় একই ব্যবসা ফেঁদে বসে এবং আবার গ্রেফতার হয়। তবে দ্বিতীয় বার গ্যাসের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পরে জয়পুরের ক্লিনিকে বসতে শুরু করেছিল সে। ডাক্তারি চলেছিল টানা প্রায় দু’বছর। কিন্তু কাকপক্ষীতেও টের পায়নি, চেম্বারে বসা এই ডাক্তারই তখন আলিগড়ে ট্যাক্সি-ছিনতাইয়ের গ্যাং‌ চালাচ্ছে। তার কলকাঠিতেই খুন হচ্ছেন একের পর এক ট্যাক্সিচালক। 

২০০৪-এ কিডনি পাচার চক্রের মামলায় জেলে যায় দেবেন্দ্র। ২০০২ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত অনেকগুলো খুনের মামলায় গ্রেফতার হয়। তার মধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয় ৬ থেকে ৭টি মামলায়।

ডাক্তার যদিও তখন গোনা ছেড়ে দিয়েছে!   

Share the post
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply